মারাঠি অস্মিতার রাজনৈতিক রাজধানী বলে পরিচিত বৃহন্মুম্বই মিউনিসিপাল কর্পোরেশন (BMC Election) অবশেষে হাতছাড়া হল ঠাকরেদের। টানা ২৮ বছর ধরে যে কর্পোরেশন ছিল বালাসাহেব ঠাকরের আদর্শ ও শিব সেনার শক্তির প্রতীক। সেই দুর্গেই গেরুয়া পতাকা উড়াল বিজেপি (BJP)। এই পরাজয় যেন ঠাকরে পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সামনে এক গভীর অস্তিত্ব সংকট।
ইলেক্ট্রনিক্স রফতানিতে নয়া ভবিষ্যতের পথে ভারত
বালাসাহেব ঠাকরের দর্শন ছিল স্পষ্ট মুম্বই মানেই শিব সেনা, আর শিব সেনা মানেই মারাঠি স্বাভিমান। সেই দর্শনের বাস্তব রূপ ছিল বিএমসি। কর্পোরেশনের প্রশাসনিক ক্ষমতা, বিপুল আর্থিক ভান্ডার এবং কর্মী সংগঠন। সব মিলিয়ে বিএমসি ছিল শিব সেনার প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে সেই প্রাণকেন্দ্রেই ছুরি বসাল বিজেপি।
২০১৭ সালে যেখানে শিব সেনা (তৎকালীন অবিভক্ত) ৮৪টি আসন জিতে কর্পোরেশনে দাপট দেখিয়েছিল। এবারে উদ্ধব ঠাকরে নেতৃত্বাধীন সেই সংখ্যা এসে দাঁড়াল ৬৫ দরজায়। একনাথ শিণ্ডের নেতৃত্বাধীন শিব সেনা আলাদা পথে হেঁটে বিজেপির জোটসঙ্গী হলেও, ঠাকরে পরিবারের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাঙ্ক আর এক ছাতার নিচে থাকল না। ফলাফল, ভাঙনের ফায়দা তুলে নিল বিজেপি?
বিশ্লেষকদের মতে, বালাসাহেবের পরবর্তী প্রজন্ম রাজনীতিতে ঐক্য ধরে রাখতে ব্যর্থ। উদ্ধব ঠাকরে এবং রাজ ঠাকরে দু’ভাইয়ের আলাদা রাজনৈতিক পথ, আলাদা ভাষ্য এবং আলাদা কৌশল মারাঠি ভোটকে বিভক্ত করেছে। ‘ঠাকরে ব্রাদার্স’ উত্তরাধিকারীরা একসঙ্গে লড়ার বদলে আলাদা আলাদা অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে নেমেছেন। তার মাশুল গুনতে হল বিএমসিতে।
এবার থেকে ইউটিউবে এই কন্টেন্ট দিলে রোজগার হবে আরও বেশি
বিএমসিতে বিজেপির ৯০ বেশি ওয়ার্ডে এগিয়ে থাকা শুধু সংখ্যার খেলা নয়, বরং নিজেদের ভীত আরও শক্ত করা। মুম্বইয়ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এখন কার্যত বিজেপির হাতে। মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশের নেতৃত্বে বিজেপি বুঝিয়ে দিল, মারাঠি রাজনীতিতে আর শুধুই ঠাকরেদের একচেটিয়া অধিকার নেই।
এই ফলাফলের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, বালাসাহেব ঠাকরের আদর্শ কি তবে সময়ের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে? নাকি সেই আদর্শকে ধরে রাখার মতো রাজনৈতিক ঐক্য ও নেতৃত্বের অভাবেই এই পতন?
তবে সব শেষ হয়ে যায়নি। দল ভাঙা, প্রতীক হারানো এবং ক্ষমতার কেন্দ্রচ্যুতি সত্ত্বেও ঠাকরে শিবির এখনও লড়াইয়ের জায়গায় রয়েছে। মুম্বইয়ের বহু ওয়ার্ডে তাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে বালাসাহেবের উত্তরাধিকার পুরোপুরি মুছে যায়নি। কিন্তু সেই উত্তরাধিকার টিকিয়ে রাখতে হলে ‘পরিবারতন্ত্র’ নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐক্য ও নতুন ভাষ্য।
মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ রাজ্য বিজেপি সভাপতি রবীন্দ্র চবনের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “এই বিএমসি জয় অন্য সব জয়ের থেকে ভিন্ন এক স্বাদ এনে দিয়েছে।”
পাশাপাশি, গেরুয়া ঝড়ে উড়ে গেল এনসিপি (শরদ) এবং এনসিপি (অজিত পাওয়ার) জোট। কাকা শরদ পাওয়ারের দলে ভাঙন ধরিয়ে বেরিয়ে এসে বিজেপির হাত ধরেছিলেন অজিত। এমনকি কাকার দলের প্রতীকও ছিনিয়ে নেন তিনি। এরপরেও, পিম্প্রি দখলে রাখতে কাকার হাত ধরেই লড়েন অজিত। সেই জোটকেও ঝড়ে উড়িয়ে দিয়েছে গেরুয়া শিবির।
পুণের ১৬৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে বিজেপি ৯০টি, কংগ্রেস ১২টি, এনসিপি (অজিত পাওয়ার) এবং (শরদ পাওয়ার)জোট ১৩টি ওয়ার্ডে এগিয়ে রয়েছে। পিম্প্রি-চিঞ্চওয়াড় পৌরসভায় ১২৮টি আসনের মধ্যে বিজেপি ৭০টি ওয়ার্ডে, এনসিপি ৪০টি ওয়ার্ডে এগিয়ে রয়েছে। নাগপুরে ১৫১ ওয়ার্ডের মধ্যে বিজেপি এগিয়ে ১০৩ ওয়ার্ডে। পশ্চিম মহারাষ্ট্রের অন্যান্য শহর, যেমন কোলাপুর, সাতারা, সোলাপুর এবং সাঙ্গলি পৌরসভাতেও বিজেপি শীর্ষস্থান দখল করেছে। মোট ২৮৬৯ ওয়ার্ডের মধ্যে বিজেপি সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এগিয়ে ১৩১৬ ওয়ার্ডের, শিবসেনা ৩৬৬, শিবসেনা (উদ্ধব শিবির) ১৬০, কংগ্রেস ২৮০ এবং এনসিপি (অজিত পাওয়ার) ১২৮ ওয়ার্ডে এগিয়ে।


