ব্রাত্য বসুকে রাজনীতি ছাড়ার পরামর্শ, সিনেমা নিয়ে বিস্ফোরক তরুণজ্যোতি

কলকাতা: বাংলা সিনেমা, সংস্কৃতি ও রাজনীতির সংযোগ ঘিরে ফের এক বিতর্কের আবহ। বঙ্গ বিজেপির মুখপাত্র তরুণজ্যোতি তিওয়ারির একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে…

পরিচালক সৃজিত মুখার্জির সাম্প্রতিক ছবি “লহ গৌরাঙ্গের নাম রে” দেখে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি শুধু সিনেমার প্রশংসাই করেননি, সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের ভূমিকা নিয়েও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। বিশেষ করে ব্রাত্য বসুকে (Bratya Basu) ঘিরে তাঁর মন্তব্য ইতিমধ্যেই শোরগোল ফেলেছে।

কলকাতা: বাংলা সিনেমা, সংস্কৃতি ও রাজনীতির সংযোগ ঘিরে ফের এক বিতর্কের আবহ। বঙ্গ বিজেপির মুখপাত্র তরুণজ্যোতি তিওয়ারির একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। পরিচালক সৃজিত মুখার্জির সাম্প্রতিক ছবি “লহ গৌরাঙ্গের নাম রে” দেখে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি শুধু সিনেমার প্রশংসাই করেননি, সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের ভূমিকা নিয়েও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। বিশেষ করে ব্রাত্য বসুকে (Bratya Basu) ঘিরে তাঁর মন্তব্য ইতিমধ্যেই শোরগোল ফেলেছে।

Advertisements

তরুণজ্যোতি তাঁর পোস্টে লেখেন, বহুদিন ধরেই “বাংলা সিনেমার পাশে দাঁড়াব” এই মানসিকতা নিয়ে হলে যান, কিন্তু অধিকাংশ সময়েই হতাশ হয়ে ফিরতে হয়। তাঁর কথায়, টিকিট কেটে সিনেমা দেখা যেন দান করার সমান হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই ছবিটি সেই ধারার ব্যতিক্রম। দীর্ঘদিন পরে তিনি আবার “পুরনো সৃজিত মুখার্জি”-কে খুঁজে পেয়েছেন বলেই দাবি করেছেন বিজেপি নেতা।

   

পোস্টে তিনি ছবির শুরুতেই ব্যবহৃত গান “ক্ষণে গোরাচাঁদ ক্ষণে কালা”-র কথা উল্লেখ করে লেখেন, এই গানই গোটা ছবির টোন বেঁধে দেয়। অরিজিৎ সিংয়ের কণ্ঠ, দৃশ্যের নির্মাণ—সব মিলিয়ে দর্শককে চুপচাপ দেখে ও শুনে যেতে বাধ্য করে। নদিয়ার বাসিন্দা হওয়ার সূত্রে কীর্তনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতির কথাও তুলে ধরেন তরুণজ্যোতি। গ্রামে অষ্টপ্রহর কীর্তনের আবহে বড় হওয়া একজন মানুষের পক্ষে কলকাতার INOX-এ বসে তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে কীর্তন শুনে গুনগুন করার অভিজ্ঞতা যে কতটা ব্যতিক্রম, তা তিনি আবেগের সঙ্গে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এই দৃশ্য যেন ইঙ্গিত দেয়—পশ্চিমবঙ্গ আবার নিজের শিকড় খুঁজে পাচ্ছে।

ছবির গঠন নিয়েও বিশদ মন্তব্য করেছেন তিনি। সিনেমার ভেতরে সিনেমা, নাটকের ভেতরে ইতিহাস, আবার মহাপ্রভুর জীবনের নানা পর্ব—এই স্তরবিন্যাস দর্শককে সময়ের মধ্যে হারিয়ে দেয় বলে মত তাঁর। একবার ঢুকে পড়লে বেরিয়ে আসার রাস্তা থাকে না, এটাকেই ছবির বড় শক্তি বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। পাশাপাশি পরিচালকের সাহসের প্রশংসা করে তরুণজ্যোতি বলেন, যে বিষয় নিয়ে কথা বলতে মানুষ ভয় পায়, সেই বিষয়কেই টেবিলের উপর রেখে আলোচনা করার সাহস দেখানো হয়েছে। কোনও মতবাদ চাপিয়ে না দিয়ে প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে—যার উত্তর হয়তো কখনও পাওয়া যাবে না।

তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন “অন্তর্ধান” ও “তিরোধান”—এই দুই শব্দের দার্শনিক ভার। বৈষ্ণব-ব্রাহ্মণ সম্পর্ক, শাক্ত ও বৈষ্ণব ভাবনা, যুদ্ধ ও অহিংসার দ্বন্দ্ব—মহাপ্রভুর অন্তরজগত নিয়ে থাকা বিভিন্ন তত্ত্ব ছবিতে স্পর্শ করা হয়েছে বলে তাঁর মন্তব্য। একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দেন, এতে কোনও ধর্মীয় আঘাত নেই, বরং প্রচলিত ধারণাগুলিকেই শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

অভিনয়ের প্রসঙ্গে তরুণজ্যোতি প্রায় সকল শিল্পীর প্রশংসা করলেও বিশেষভাবে আলাদা করে তুলে ধরেছেন ব্রাত্য বসুর অভিনয়। গিরিশ ঘোষের চরিত্রে তাঁর অভিনয়কে “দুর্দান্ত” বলে উল্লেখ করে তিনি লেখেন, “ব্রাত্য বসু, আপনি রাজনীতিতে কী করছেন? অবিলম্বে রাজনীতি ছেড়ে থিয়েটার আর সিনেমায় মন দিন।” তাঁর মতে, ব্রাত্য রাজনীতিতে থাকলে রাজনীতির বিশেষ লাভ হবে না, কিন্তু সিনেমা থেকে সরে গেলে শিল্পজগতের বড় ক্ষতি হবে। বিনোদিনীর যন্ত্রণা, গিরিশ ঘোষের সংলাপ, নাটকের মুহূর্ত—সব মিলিয়ে “The show must go on” ভাবনাটিকে অসাধারণভাবে তুলে ধরা হয়েছে বলে তিনি মত দেন।

তবে প্রশংসার পাশাপাশি হালকা কটাক্ষও রেখেছেন বিজেপি মুখপাত্র। কিছু দৃশ্যকে অপ্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করেছেন, কোথাও কোথাও ‘কোটা অভিনেতা’ নেওয়ার প্রবণতা নিয়েও খোঁচা দিয়েছেন। তাঁর মতে, এতে সিনেমার সামগ্রিক আবহে খানিক ব্যাঘাত ঘটে। এমনকি ভবিষ্যতে টলিউডে “কোটা বিরোধী আন্দোলন” দেখা যেতে পারে বলেও ব্যঙ্গ করেছেন তিনি।

শেষ দৃশ্য—ফোন কল, মেসেজ, এক্সপ্রেশন, বাথটাব—এই সবকিছু নিয়ে তিনি লেখেন, “কিছু বলার নেই।” কবিতার পঙ্‌ক্তি টেনে এনে বলেন, “সে চলে গেলেও নদীতে খেলবে চির পরিচিত জোয়ার ভাটা।” ছবির আবেগী সমাপ্তি তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে বলেই স্পষ্ট।

সব মিলিয়ে তরুণজ্যোতির বক্তব্যে একদিকে যেমন সৃজিত মুখার্জির পরিচালনার প্রশংসা, তেমনই রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও শিল্পীর কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার বার্তা স্পষ্ট। তিনি লিখেছেন, সৃজিতের রাজনৈতিক মতাদর্শ ও কিছু কর্মকাণ্ডের তিনি বিরোধী ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন—তবু একটি ভালো সিনেমা উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানানো অন্যায় হবে না।

এই পোস্ট ঘিরে ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে রাজনৈতিক শিবিরের টানাপোড়েন, অন্যদিকে শিল্পের স্বাতন্ত্র্য—সব মিলিয়ে তরুণজ্যোতির এই মন্তব্য যেন আবারও প্রশ্ন তুলছে, রাজনীতি আর সংস্কৃতির সীমারেখা ঠিক কোথায় টানা উচিত।

Advertisements