লিঙ্কডইনের (LinkedIn) সহ-প্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যান সম্প্রতি প্রকাশিত একটি মন্তব্যে স্টার্টআপ কর্মীদের জন্য তাঁর বিতর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, লিঙ্কডইনের প্রথম দিনগুলোতে কর্মীদের পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার পর বাড়ি থেকে ল্যাপটপ খুলে আবার কাজে ফিরে আসার প্রত্যাশা করা হতো। এই মন্তব্য গত বছর একটি পডকাস্টে তাঁর দেওয়া বক্তব্য থেকে উঠে এসেছে, যা স্টার্টআপে কাজ এবং জীবনের ভারসাম্য নিয়ে তাঁর কঠোর মনোভাবকে প্রকাশ করে।
হফম্যান গত বছর ‘ডায়েরি অফ এ সিইও’ পডকাস্টে বলেছিলেন, “যখন আমরা লিঙ্কডইন শুরু করি, তখন আমাদের দলে এমন লোকজন ছিল যাদের পরিবার ছিল। তাই আমরা বলতাম, ঠিক আছে, বাড়ি গিয়ে পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে নাও। তারপর, খাওয়ার পর ল্যাপটপ খুলে আবার কাজে ফিরে এসো এবং আমাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যাও।” এই কথাগুলো লিঙ্কডইনের প্রাথমিক দিনগুলোর কঠোর কাজের সংস্কৃতির একটি ঝলক দেয়, যা ২০১৬ সালে মাইক্রোসফটের ২৬.২ বিলিয়ন ডলারে অধিগ্রহণের পথ প্রশস্ত করেছিল।
স্টার্টআপে জীবন-কাজের ভারসাম্য নেই: হফম্যান
রিড হফম্যান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে স্টার্টআপে সাফল্যের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম অপরিহার্য। ২০১৪ সালে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ‘হাউ টু স্টার্ট এ স্টার্টআপ’ ক্লাসে তিনি বলেছিলেন, “যদি আমি কোনো স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতাকে বলতে শুনি, ‘আমি এভাবে আমার জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখি’—তবে বুঝতে হবে তারা জয়ের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়।” তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি মহামারীর পর কর্মক্ষেত্রে সুস্থতা নিয়ে বাড়তি আলোচনার মধ্যেও অপরিবর্তিত রয়েছে। ‘ডায়েরি অফ এ সিইও’ পডকাস্টে তিনি আরও বলেন, “জীবন-কাজের ভারসাম্য স্টার্টআপের খেলা নয়।”
হফম্যান তাঁর সমালোচকদের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, যারা এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ‘বিষাক্ত’ বলে মনে করে, তারা স্টার্টআপের বাস্তবতা বোঝে না। তিনি বলেন, “যারা মনে করে এটি বিষাক্ত, তারা স্টার্টআপের খেলাটাই বোঝে না এবং তারা ভুল। এই খেলাটি তীব্র। আর যদি তুমি এটি না করো, তবে শেষ পর্যন্ত তোমার চাকরি থাকবে না।” তিনি এই কঠোর পরিশ্রমের আর্থিক পুরস্কারের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, লিঙ্কডইনের প্রায় ১০০ জন প্রাথমিক কর্মী কোম্পানির সাফল্যের পর এমন আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য অর্জন করেছেন যে তাঁদের আর কাজ করার প্রয়োজন নেই।
লিঙ্কডইনের প্রথম দিনগুলোর কাজের সংস্কৃতি
লিঙ্কডইন যখন ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এটি ছিল একটি ছোট স্টার্টআপ। রিড হফম্যান এবং তাঁর দলের লক্ষ্য ছিল পেশাদার নেটওয়ার্কিংয়ের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যা আজ বিশ্বের বৃহত্তম পেশাদার সামাজিক মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। তবে, এই সাফল্যের পিছনে ছিল একটি অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন কাজের সংস্কৃতি। হফম্যানের মতে, স্টার্টআপে কাজ করা মানে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দেওয়া। তিনি কর্মীদের পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ দিলেও, রাতে কাজে ফিরে আসার প্রত্যাশা করতেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গি লিঙ্কডইনের প্রাথমিক সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ২০১৬ সালে মাইক্রোসফট যখন লিঙ্কডইনকে ২৬.২ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়, তখন এটি প্রযুক্তি জগতের একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়ে ওঠে। হফম্যানের মতে, এই সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছিল শুধুমাত্র কর্মীদের নিরলস পরিশ্রমের কারণে।
সমালোচনা ও বিতর্ক
হফম্যানের এই মন্তব্য সম্প্রতি পুনরায় প্রকাশিত হওয়ার পর তা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মহামারীর পর থেকে কর্মক্ষেত্রে সুস্থতা এবং জীবন-কাজের ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। অনেক কোম্পানি কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য নমনীয় সময়সূচি এবং ছুটির নীতি চালু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে হফম্যানের কঠোর অবস্থান অনেকের কাছে ‘বিষাক্ত’ মনে হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, এই ধরনের কাজের সংস্কৃতি কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে, হফম্যান এই সমালোচনাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, “স্টার্টআপের জগৎ এমনই। এটি একটি তীব্র প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, যেখানে বেঁচে থাকতে হলে সবকিছু দিতে হয়।” তাঁর যুক্তি, যারা এই তীব্রতা সহ্য করতে পারে না, তারা স্টার্টআপে টিকে থাকার জন্য উপযুক্ত নয়।
আর্থিক পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি
হফম্যান এই কঠোর পরিশ্রমের পক্ষে আরেকটি যুক্তি দিয়েছেন—আর্থিক সাফল্য। তিনি উল্লেখ করেছেন যে লিঙ্কডইনের প্রায় ১০০ জন প্রাথমিক কর্মী এখন এমন অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যে আছেন যে তাঁদের আর কাজ করতে হবে না। এই আর্থিক পুরস্কার তাঁর মতে, স্টার্টআপে অতিরিক্ত পরিশ্রমের ন্যায্য ফল। তিনি বলেন, “যদি তুমি জিততে পারো, তবে এই পরিশ্রমের ফল অসাধারণ হবে।”
স্টার্টআপের বাস্তবতা
স্টার্টআপের জগৎ সত্যিই একটি চ্যালেঞ্জিং ক্ষেত্র। নতুন কোম্পানিগুলোকে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে দ্রুত ফলাফল দেখাতে হয়। হফম্যানের মতে, এই পরিবেশে জীবন-কাজের ভারসাম্য বজায় রাখার চিন্তা বিলাসিতা। তিনি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা ও কর্মীদের উৎসাহ দেন সবকিছু ঝুঁকিতে ফেলে জয়ের জন্য লড়তে।
তবে, আধুনিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে এই দৃষ্টিভঙ্গি এখন ক্রমশ বিরল হয়ে আসছে। গুগল, মাইক্রোসফটের মতো বড় কোম্পানি এবং এমনকি অনেক স্টার্টআপও কর্মীদের জন্য নমনীয় কাজের পরিবেশ তৈরি করছে। হফম্যানের এই পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি তাই নতুন প্রজন্মের কাছে বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।
বাংলার প্রেক্ষাপটে প্রভাব
বাংলার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্টার্টআপের প্রতি আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। কলকাতা এবং অন্যান্য শহরে অনেক নতুন উদ্যোক্তা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কাজ শুরু করেছেন। হফম্যানের এই দৃষ্টিভঙ্গি তাদের জন্য একটি শিক্ষা হতে পারে, যে সাফল্যের পথ সহজ নয়। তবে, এটি একটি প্রশ্নও তুলেছে—সাফল্যের জন্য কি সত্যিই জীবনের অন্যান্য দিক ত্যাগ করতে হবে?
রিড হফম্যানের মন্তব্য স্টার্টআপের কঠোর বাস্তবতার একটি প্রতিফলন হলেও, এটি আধুনিক সময়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। লিঙ্কডইনের সাফল্য তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ হতে পারে, কিন্তু কর্মীদের সুস্থতার প্রতি ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের যুগে এটি অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। স্টার্টআপে কাজের সংস্কৃতি নিয়ে এই বিতর্ক ভবিষ্যতে আরও আলোচনার জন্ম দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।