মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এখনই থামার নয়। ইরান ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালীর তলদেশ দিয়েই ইন্টারনেটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কেবল বা তার ফেলা আছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে আপাতত তেলের ঘাঁটিগুলোকে নিশানা করা হচ্ছে। এই অবস্থায় প্রশ্ন হল- তেহরান কি পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালীর তলদেশের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবে?
হরমুজ প্রণালী ইতিমধ্যেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার পাশাপাশি, এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে যে লোহিত সাগরের ‘বাব-এল-মান্দেব’ প্রণালীও ইরানের মদতপুষ্ট হুথি বাহিনীর হামলার শিকার হতে পারে কিনা। বিশ্বের ডিজিটাল যোগাযোগের ধমনীস্বরূপ সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে বিস্তৃত ইন্টারনেট তার বা কেবলগুলোও এই পথ দিয়েই অতিক্রম করেছে।
ইরান হরমুজ প্রণালীজুড়ে সমুদ্র মাইন পেতে রেখেছে! এর ফলে জাহাজ পরিবহন সংস্থা এবং বিমা কোম্পানিগুলো এতটাই ভয় পেয়েছে যে, নিরাপদ পথ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ দিয়ে তারা সব ধরনের নৌ-চলাচল স্থগিত রেখেছে।
হরমুজ ও লোহিত সাগরের বাব-এল-মান্দেব- এই দু’টি গুরুত্বপূর্ণ প্রণালীর তলদেশে বিশাল ফাইবার-অপটিক ক্যাবল নেটওয়ার্ক রয়েছে। এই সরু তারগুলো হাজার হাজার কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এবং এগুলোই সেই প্রায় সমস্ত তথ্য বা ‘ডেটা’ বহন করে, যার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবস্থা সচল থাকে – ভিডিও কল ও ই-মেইল থেকে শুরু করে ব্যাঙ্কিং লেনদেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক সেবা পর্যন্ত সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত।
লোহিত সাগর এবং হরমুজ প্রণালীতে অন্তত ২০টি সাব-সি ক্যাবল বা সমুদ্র-তলদেশীয় ক্যাবল রয়েছে।
একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে, লোহিত সাগরের তলদেশ দিয়ে মোট সতেরোটি সাবমেরিন ক্যাবল বিস্তৃত রয়েছে। এই ক্যাবলগুলো দিয়েই ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী ইন্টারনেট ট্রাফিকের সিংহভাগ হয়ে থাকে।
হরমুজ প্রণালী অতিক্রমকারী ক্যাবলগুলোর গুরুত্বও অপরিসীম। ক্যাবল-সংক্রান্ত তথ্যের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উৎস ‘টেলিজিওগ্রাফি’ -এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরে বর্তমানে সক্রিয় সাব-সি ক্যাবলগুলোর মধ্যে রয়েছে – AAE-1, FALCON, Gulf Bridge International Cable System এবং Tata-TGN Gulf। এই ক্যাবল লাইনগুলো সরাসরি ভারতের আন্তর্জাতিক ডেটা সংযোগ ব্যবস্থাকে সহায়তা প্রদান করে থাকে।
ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘টেলিজিওগ্রাফি’র অ্যালান মউলডিন বলেছেন, “যেসব এলাকায় সক্রিয় সামরিক অভিযান চলছে, সেখানে মেরামতকারী জাহাজগুলো কাজ করবে না, কারণ তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।”
হুথিদের হামলার কারণে যেভাবে ইন্টারনেট সংযোগ ব্যাহত হয়েছিল:
নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেনটিক’-এর ইন্টারনেট বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক এবং ইন্টারনেট বিশ্লেষক ডগ ম্যাডোরি বর্তমান ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। ‘রেস্ট অফ ওয়ার্ল্ড’ নামক প্রকাশনাটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ম্যাডোরি বলেন, “একই সময়ে উভয় ‘চোক পয়েন্ট’ বা সংকীর্ণ পথ অবরুদ্ধ হয়ে যাওয়াটা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী একটি ঘটনা হবে।”
সূত্রের খবর, হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের জলের গভীরতা মাত্র ২০০ ফুট, যার অর্থ হল, সমুদ্রের তলদেশে স্থাপিত ক্যাবল বা তারগুলো অপেক্ষাকৃত অগভীর জলেই অবস্থান করছে।
একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অঞ্চলে ইরানের বেশ কিছু যুদ্ধজাহাজ অতীতে ডুবিয়ে দেওয়া হলেও, বর্তমানেও তাদের ডুবোজাহাজ-ভিত্তিক বিশেষ দল এবং ‘ছায়া নৌবহর’ (shadow fleet) গোপনে ওই এলাকায় মোতায়েন রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
যদিও ইরান সত্যিই এই তারগুলোকে নিশানা করে তবে তার পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর। প্রণীলর তলদেশের ইন্টারনেট-তারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব কেবল ফোন বা ওয়েবসাইট ব্যবহারের মধ্যেই শুধু সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা কুপ্রভাব আরও অনেক বিস্তৃত ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়বে।
আপাতত তারগুলো সচল রয়েছে এবং কাজ করে যাচ্ছে। তবে সমুদ্রের জলে মাইন বা বিস্ফোরকের উপস্থিতি, অব্যাহত হামলা এবং মেরামতের কাজে নিয়োজিত জাহাজগুলোর প্রবেশাধিকার রুদ্ধ হওয়ার কারণে – এই মুহূর্তে ঝুঁকি বা বিপদ অতীতের যেকোনও সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।




















