
অনলাইনে খাবার বা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস অর্ডার দেওয়া এখন আর শুধুই বিলাসিতা নয়, বরং শহুরে জীবনের এক অপরিহার্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অফিসের চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, রাত জেগে কাজ কিংবা হঠাৎ অতিথি—সব পরিস্থিতিতেই মানুষের ভরসা এখন অ্যাপ-নির্ভর ডেলিভারি পরিষেবা। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই ২০২৫ সালের শেষে সুইগি (Swiggy) তাদের ইনস্টামার্ট ও ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মের যে বছরশেষের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তা রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। কারণ এই রিপোর্টে উঠে এসেছে এমন কিছু ‘সুপার কনজিউমার’-এর গল্প, যাঁদের অনলাইন খরচের অঙ্ক শুনলে চোখ কপালে ওঠাই স্বাভাবিক।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে চেন্নাইয়ের এক গ্রাহকের নাম—যিনি এক বছরে শুধু কন্ডোম কিনতেই খরচ করেছেন প্রায় ১ লক্ষ টাকা। সুইগির তথ্য অনুযায়ী, ওই গ্রাহক ২০২৫ সালে মোট ২২৮ বার কন্ডোম অর্ডার করেছেন। অর্থাৎ, গড়ে প্রায় প্রতিদিনই একটি করে অর্ডার! এই তথ্য সামনে আসতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো হাসি-ঠাট্টা ও মিমের ঝড় ওঠে। কেউ মজা করে লিখেছেন, “এটাই বোধহয় নিয়মিত রুটিন,” আবার কেউ বলছেন, “চেন্নাইবাসীর জীবনযাপন সত্যিই আলাদা!”
তবে এই চেন্নাইবাসীই একমাত্র নজরকাড়া ‘সুপার কনজিউমার’ নন। সুইগির বছরশেষের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের এক গ্রাহক একাই প্রায় ২২ লক্ষ টাকার অর্ডার দিয়েছেন। এই বিপুল অঙ্কের মধ্যে রয়েছে দৈনন্দিন গ্রোসারি, খাবার তো বটেই, সঙ্গে একাধিক প্রিমিয়াম স্মার্টফোন। রিপোর্ট বলছে, ওই গ্রাহক এক বছরে প্রায় ২২টি আইফোন অর্ডার করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অনলাইন শপিংয়ের ‘ইম্পালস বাইং’ বা মুহূর্তের সিদ্ধান্তে কেনাকাটার চরম উদাহরণ।
এতেই শেষ নয়। সুইগির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আরেক গ্রাহক বছরে প্রায় ১৬.৩ লক্ষ টাকার এনার্জি ড্রিঙ্ক—বিশেষ করে রেড বুল—অর্ডার করেছেন। শহুরে কর্মজীবনের চাপ, নাইট শিফট, স্টার্টআপ সংস্কৃতি কিংবা ফিটনেস-সংক্রান্ত অভ্যাস—যে কারণই থাকুক, এই অঙ্ক শুনে অনেকেই অবাক। সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ রসিকতা করে মন্তব্য করেছেন, “এই পরিমাণ এনার্জি ড্রিঙ্কে গোটা পাড়ার লোক রাত জেগে কাজ করতে পারবে!”
সুইগির রিপোর্টে আরও উঠে এসেছে ‘কুইর্কি কার্ট’-এর তথ্য। কখনও দেখা গেছে, একই অর্ডারে রয়েছে দামি স্মার্টফোন ও লেবুর শরবত, আবার কখনও মধ্যরাতে আইসক্রিমের সঙ্গে অফিস স্টেশনারি। এই ধরনের অদ্ভুত কিন্তু মজার অর্ডারের ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে বেঙ্গালুরু, যদিও চেন্নাই ও মুম্বইও খুব একটা পিছিয়ে নেই। এই প্রবণতা দেখিয়ে দেয়, দ্রুত ডেলিভারি পরিষেবা কীভাবে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন আর হঠাৎ ইচ্ছেকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিসংখ্যান আসলে ভারতের বদলে যাওয়া ভোক্তা সংস্কৃতিরই প্রতিচ্ছবি। দ্রুত ডেলিভারি, সহজ ডিজিটাল পেমেন্ট এবং ‘১০-১৫ মিনিটে দরজায় ডেলিভারি’-র প্রতিশ্রুতি মানুষকে আরও বেশি অনলাইননির্ভর করে তুলছে। বিশেষ করে মেট্রো শহরগুলিতে সময়ের মূল্য এতটাই বেশি যে, অনেকেই বাড়তি খরচ করতেও দ্বিধা করছেন না। একই সঙ্গে টিয়ার-টু শহরগুলিতেও সুইগির মতো প্ল্যাটফর্মের দ্রুত প্রসার ঘটছে, যা আগামী দিনে এই ধরনের ‘সুপার কনজিউমার’-এর সংখ্যা আরও বাড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই প্রবণতা নিয়ে সতর্কবার্তাও দিচ্ছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, সুবিধার আড়ালে যেন অতিরিক্ত খরচ ও অপচয়ের ফাঁদে না পড়ে সাধারণ মানুষ। অনলাইনে কয়েক সেকেন্ডে অর্ডার করার অভ্যাস অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটাকে উৎসাহিত করে, যা মাসের শেষে বড় অঙ্কের বিল হয়ে দাঁড়ায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চেন্নাইয়ের ওই লাখ টাকার কন্ডোম কেনা ‘সুপার কনজিউমার’ শুধু হাসি-মজার বিষয় নয়, বরং আধুনিক শহুরে ভারতের এক বাস্তব ছবি। যেখানে একদিকে রয়েছে চরম স্বাচ্ছন্দ্য ও দ্রুত পরিষেবা, অন্যদিকে রয়েছে লাগামছাড়া খরচের ঝুঁকি। এই দুইয়ের মাঝামাঝি দাঁড়িয়েই এগিয়ে চলেছে ভারতের অনলাইন ফুড ও কুইক কমার্স সংস্কৃতি।










