শিলিগুড়ি: পর্যটন, ক্ষুদ্র শিল্প ও পরিকাঠামোর জোরে উত্তরবঙ্গের (North Bengal) অর্থনীতিতে বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। রাজ্য শিল্প দফতর ও শিল্পমহলের সূত্রে জানা যাচ্ছে, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যাচাই করা বিনিয়োগের অঙ্ক ইতিমধ্যেই ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই বিপুল লগ্নির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শিলিগুড়ি ও পার্শ্ববর্তী জেলা—যা দার্জিলিং, সিকিম এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত।
সবচেয়ে বড় আকর্ষণ পর্যটন ও হসপিটালিটি সেক্টর। দেশের প্রথম সারির হোটেল সংস্থা IHCL এবং IHG উত্তরবঙ্গে ব্যাপক বিনিয়োগের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। শিলিগুড়ি ও আশপাশের এলাকায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ২০টিরও বেশি নতুন হোটেল ও রিসর্ট গড়ে তোলার রূপরেখা তৈরি হয়েছে। শিল্পমহলের মতে, উত্তরবঙ্গের পর্যটন প্রবাহ দ্রুত বাড়ছে—বিশেষ করে পাহাড়, চা-বাগান ও সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলির সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধার কারণে। এই বাড়তি চাহিদাকেই কাজে লাগাতে চাইছে বড় হোটেল চেনগুলি।
পর্যটনের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাড়া মিলছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার MSME বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা পড়েছে। দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও কালিম্পং—এই তিন জেলাতেই প্রস্তাবিত বিনিয়োগের অঙ্ক ৩,১২৯ কোটি টাকা। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং, হস্তশিল্প, চা-ভিত্তিক শিল্প এবং হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং—এই সব ক্ষেত্রেই নতুন কারখানা ও ইউনিট গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
রাজ্য সরকারের শিল্প সম্মেলন ও রোডশোতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ স্পষ্ট। প্রশাসনের দাবি, জমি বরাদ্দ, বিদ্যুৎ সংযোগ ও এক জানালা ব্যবস্থার মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করায় উত্তরবঙ্গ এখন বিনিয়োগবান্ধব গন্তব্য হিসেবে উঠে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে যে ‘ইস্টার্ন ইকোনমিক করিডর’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, এই বিনিয়োগ তারই বাস্তব রূপ।
এই উন্নয়নের সরাসরি প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানে। হোটেল, রিসর্ট ও পর্যটন পরিষেবায় হাজার হাজার নতুন চাকরি তৈরি হবে বলে অনুমান। পাশাপাশি MSME ইউনিটগুলি চালু হলে স্থানীয় যুবসমাজের জন্য দক্ষ ও আধা-দক্ষ কাজের সুযোগ বাড়বে। ফলে কাজের খোঁজে বড় শহরে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে বলেও মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, শিলিগুড়ির গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। এখানে বিমানবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগ একসঙ্গে থাকায় দার্জিলিং ও সিকিমগামী পর্যটকদের বড় অংশ এই শহর দিয়েই যাতায়াত করেন। নতুন হোটেল ও পরিকাঠামো তৈরি হলে পর্যটকদের থাকার সমস্যা কমবে এবং গড়ে অবস্থানকাল বাড়বে—যার সুফল পড়বে স্থানীয় বাজার, পরিবহণ ও পরিষেবা খাতে।
Leading national hotel chains are set to infuse over ₹10,000 crore into Siliguri and northern districts of West Bengal, while the region has drawn around ₹4,000 crore in the MSME sector in the past couple of years. pic.twitter.com/aPtv7OAN5b
— The West Bengal Index (@TheBengalIndex) December 7, 2025
সম্প্রতি ৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে Telegraph India জানিয়েছে, উত্তরবঙ্গে এই বিনিয়োগ প্রবাহ রাজ্যের পূর্বমুখী অর্থনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। পাহাড়ের পাদদেশে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিক কার্যকলাপও ত্বরান্বিত হচ্ছে। রাজ্য সরকার মনে করছে, সঠিক পরিকল্পনা ও সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী পাঁচ বছরে উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক চেহারা আমূল বদলে যাবে।
সব মিলিয়ে, ১০ হাজার কোটিরও বেশি বিনিয়োগ শুধু সংখ্যার খেলা নয়—এটি উত্তরবঙ্গের শিল্প, পর্যটন ও কর্মসংস্থানের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। পাহাড় ও সমতলের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলের অর্থনীতি যে আগামী দিনে আরও শক্ত ভিত পাবে, তা বলাই যায়।
