জাতীয় নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে বড় সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে ভারত। প্রায় ২০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক ড্রোন কেনার প্রস্তাব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে ভারতীয় সেনার (Indian Army)। সূত্রের খবর, এই প্রকল্পের আওতায় মূলত দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি আধুনিক ‘কামিকাজে’ বা লয়টারিং মিউনিশন ড্রোন সংগ্রহ করা হবে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত হামলায় ব্যবহৃত হবে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে জানা গেছে, দ্রুত ক্রয় প্রক্রিয়া বা ফাস্ট-ট্র্যাক পদ্ধতিতে প্রায় ৮৫০টি ড্রোন কেনার প্রস্তাব ইতিমধ্যেই প্রস্তুত করা হয়েছে। এই প্রস্তাব চলতি মাসেই প্রতিরক্ষা বিষয়ক সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক সংস্থা Defence Acquisition Council (ডিএসি)-র অনুমোদন পেতে পারে। অনুমোদন মিললেই সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে এই ড্রোন অন্তর্ভুক্ত করার কাজ শুরু হবে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে সাম্প্রতিক সামরিক অভিজ্ঞতার বড় ভূমিকা রয়েছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তের ওপারে সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটি ধ্বংসে ড্রোনের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত এক সামরিক অভিযানে ড্রোন ব্যবহারের সাফল্য সেনার পরিকল্পনাকে আরও জোরালো করেছে। ওই অভিযানে প্রথম দিনেই ৯টি জঙ্গি ঘাঁটির মধ্যে ৭টিকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা সম্ভব হয় বলে দাবি করা হয়। এই অভিযানের পটভূমিতে ছিল পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলায় ২৬ জন নিরীহ মানুষের মৃত্যু, যার পাল্টা জবাব হিসেবেই এই কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
নতুন যে ড্রোনগুলি কেনা হবে, সেগুলি শুধু আত্মঘাতী হামলার জন্য নয়, নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজেও ব্যবহৃত হবে। সেনা সূত্রে জানা যাচ্ছে, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রতিটি পদাতিক ব্যাটালিয়নের সঙ্গে একটি বিশেষ ‘অশনি’ প্লাটুন যুক্ত করার ভাবনা রয়েছে। এই প্লাটুন মূলত ড্রোন অপারেশন, শত্রুপক্ষের অবস্থান চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক হামলার দায়িত্বে থাকবে।
দীর্ঘমেয়াদে ভারতীয় সেনা প্রায় ৩০ হাজার ড্রোন সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়েছে বলে খবর। এর মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে ধীরে ধীরে নির্ভুল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মানববিহীন যুদ্ধ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। আধুনিক যুদ্ধে যেখানে ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে, সেখানে ভারতের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এই প্রকল্পে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নীতির উপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনীর প্রয়োজন অনুযায়ী দেশীয় সংস্থাগুলিকেই ড্রোন তৈরির সুযোগ দেওয়া হবে, যাতে বিদেশি নির্ভরতা কমে এবং দেশের প্রতিরক্ষা শিল্প আরও মজবুত হয়। ইতিমধ্যেই একাধিক ভারতীয় স্টার্টআপ ও প্রতিরক্ষা সংস্থা লয়টারিং মিউনিশন ও নজরদারি ড্রোন তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।
তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে কিছু প্রশ্নও উঠছে। বিরোধীদের একাংশের মতে, এত বড় অঙ্কের প্রতিরক্ষা খরচের সঙ্গে সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। যদিও সরকারের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, সমস্ত নিয়ম মেনেই এই ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থই এখানে সর্বাগ্রে বিবেচিত হবে।
সব মিলিয়ে, ২০০০ কোটি টাকার ড্রোন কেনার এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় সেনার যুদ্ধক্ষমতায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে। সীমান্ত সুরক্ষা, সন্ত্রাস দমন এবং ভবিষ্যতের আধুনিক যুদ্ধে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এই ড্রোনগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেই মনে করছে প্রতিরক্ষা মহল। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রযুক্তিগত শক্তি বাড়াতে ভারতের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলেও নজর কেড়েছে।
