
নয়াদিল্লি: ভারতের ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকা বিপুল খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার (India gold reserve) নতুন করে আলোচনায়। ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে চালানো ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষায় একাধিক বড় সোনার খনি ও সম্ভাব্য রিজার্ভের সন্ধান মিলেছে বলে সরকারি ও গবেষণা সংস্থার রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্নাটকে পাওয়া এই সোনার ভাণ্ডার ভারতের খনিজ আত্মনির্ভরতার পথে বড় পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই আবিষ্কার বাস্তবে উৎপাদনে রূপ নিলে দেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওড়িশার একাধিক জেলায় সাম্প্রতিক সমীক্ষায় প্রায় ১০ থেকে ২০ টন সোনার সম্ভাব্য রিজার্ভের ইঙ্গিত মিলেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রদেশের জবলপুর এলাকায় নতুন করে সোনার উপস্থিতি চিহ্নিত হয়েছে, যা ওই রাজ্যে খনিজ শিল্পের সম্ভাবনা আরও বাড়াল। অন্ধ্রপ্রদেশের কুরনুল জেলার জোন্নাগিরি প্রকল্প ইতিমধ্যেই উৎপাদনের দোরগোড়ায়, যেখানে বাণিজ্যিক খনন শুরু হলে দেশের অভ্যন্তরীণ সোনা উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে আশা। অন্যদিকে কর্নাটকের উচ্চমানের সোনার খোঁজ—বিশেষ করে ঐতিহাসিক কোলার গোল্ড ফিল্ডস অঞ্চলের আশপাশে—আবারও রাজ্যটিকে সোনার মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই আবিষ্কারগুলির সবচেয়ে বড় তাৎপর্য ভারতের সোনা আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনায়। ২০২৪ সালে ভারতের মোট সোনা আমদানির হার ছিল প্রায় ৮৬ শতাংশ। ঘরোয়া উৎপাদন বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে, চলতি খাতে ঘাটতি কমবে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদার হবে। বিশেষ করে বৈশ্বিক বাজারে সোনার দামের ওঠানামার সময় দেশীয় উৎপাদন অর্থনীতিকে কিছুটা হলেও সুরক্ষা দিতে পারবে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতের সরকারি সোনা মজুত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭৯.৬ টনে। শুধু ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষেই প্রায় ৫৭.৫ টন সোনা মজুতে যোগ হয়েছে। গবেষণা সংস্থা SBI Research-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন খনি প্রকল্পগুলি সফলভাবে উৎপাদনে এলে আগামী কয়েক বছরে সোনার আমদানির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। এর ফলে শিল্পোৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলবে।
তবে আশাবাদের পাশাপাশি সংশয়ও রয়েছে। অতীতে বহুবার বড় খনিজ আবিষ্কারের ঘোষণা এলেও তা বাণিজ্যিক খননে রূপ নিতে দীর্ঘ সময় লেগেছে, বা কোনও কোনও ক্ষেত্রে আদৌ বাস্তবায়িত হয়নি—এমন উদাহরণও কম নয়। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই তাই সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, অনুসন্ধান আর বাণিজ্যিক খননের মধ্যে বিস্তর ফারাক। পরিবেশগত ছাড়পত্র, জমি অধিগ্রহণ, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে প্রকল্পগুলি বাস্তবে কত দ্রুত এগোয়, সেটাই আসল প্রশ্ন।
তবুও সামগ্রিকভাবে এই আবিষ্কারগুলিকে ঘিরে দেশজুড়ে ইতিবাচক সাড়া মিলছে। ‘আত্মনির্ভর খনিজ’ ভাবনার সঙ্গে এই সাফল্যকে মিলিয়ে দেখছেন অনেকেই। জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে—কেউ কেউ কর্নাটকের সোনার ইতিহাস টেনে ‘কেজিএফ’-এর মতো ছবির প্রসঙ্গ তুলছেন, আবার কেউ বাস্তব উন্নয়নের অপেক্ষায় সংযত আশাবাদ প্রকাশ করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক নীতি সহায়তা, স্বচ্ছ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই সোনার খনিগুলি ভারতের অর্থনীতিতে গেম-চেঞ্জার হয়ে উঠতে পারে। খনিজ ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা বাড়ানোই যদি লক্ষ্য হয়, তবে এই আবিষ্কারগুলি সেই লক্ষ্যে এক বড় পদক্ষেপ—যা ভবিষ্যতে দেশের আর্থিক ভিত আরও মজবুত করতে সক্ষম।










