
প্রাচীন চিকিৎসা-পদ্ধতিকে আধুনিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে কোটি কোটি ডলার আয় করছে ভারত—এমনই ছবি ধরা পড়ছে সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিতে। আয়ুর্বেদ (Ayurveda), যোগ, ইউনানি, সিদ্ধা ও হোমিওপ্যাথি—এই পাঁচটি ধারাকে একত্রে AYUSH ব্যবস্থা বলা হয়। বহু শতাব্দী ধরে ভারতে চর্চিত এই চিকিৎসা-পদ্ধতিগুলি এখন শুধু ঘরোয়া ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্ববাজারে ভারতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে AYUSH পণ্য ও পরিষেবার রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮৮.৮৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৬.১১ শতাংশ বৃদ্ধি। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক চিকিৎসা ও ভেষজ পণ্যের প্রতি বিশ্বজুড়ে আগ্রহ বাড়ায় এই খাতে ভারতের রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে কোভিড-পরবর্তী সময়ে ইমিউনিটি বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি রোগের বিকল্প চিকিৎসা ও জীবনযাত্রাভিত্তিক থেরাপির দিকে ঝোঁক বেড়েছে।
এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা নিয়েছে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি। ওমান ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে স্বাক্ষরিত নতুন চুক্তিতে ভারতের AYUSH ব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ওই দেশগুলিতে আয়ুর্বেদিক ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় চিকিৎসা-পণ্য বাজারজাত করা অনেক সহজ হয়েছে। শুল্কছাড়, নিয়ন্ত্রক বাধা কমানো এবং মান্যতার স্বীকৃতির কারণে ভারতীয় সংস্থাগুলি এখন আরও প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য রপ্তানি করতে পারছে।
দৃশ্যত এই পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেই উঠে আসছে হলুদ, তুলসী, অ্যালোভেরা, অশ্বগন্ধার মতো ভেষজ উপাদান এবং দিল্লিতে অবস্থিত AYUSH মন্ত্রকের আধুনিক ভবনের ছবি। একদিকে হাজার বছরের প্রাচীন জ্ঞান, অন্যদিকে আধুনিক নীতি ও বাণিজ্যিক কাঠামো—এই মেলবন্ধনই ভারতের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
AYUSH মন্ত্রকের আধিকারিকদের মতে, সরকার শুধু রপ্তানি বাড়ানোর দিকেই নজর দিচ্ছে না, বরং গুণমান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক প্রচার বাড়ানোর উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগ—যেমন আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, স্ট্রেস-জনিত সমস্যায়—আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা সহায়ক ভূমিকা নিতে পারে। এই ধরনের গবেষণা বিশ্ববাজারে আস্থা বাড়াতে সাহায্য করছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, AYUSH খাত শুধু রপ্তানি আয়ই বাড়াচ্ছে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ভেষজ চাষ, প্রক্রিয়াকরণ ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পের মাধ্যমে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ি ও বনাঞ্চলঘেঁষা এলাকায় ঔষধি গাছের চাষ কৃষকদের অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ দিচ্ছে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে মান নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল রোধ এবং ক্লিনিক্যাল ডেটা আরও শক্তিশালী করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি, বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার আলাদা আলাদা মানদণ্ড মেনে চলাও বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে, আয়ুর্বেদ ও AYUSH ব্যবস্থা আজ ভারতের সফট পাওয়ার ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। প্রাচীন ঐতিহ্যকে আধুনিক বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভারত যে কোটি কোটি ডলারের বাজার গড়ে তুলতে পেরেছে, তা আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনাই দেখাচ্ছে।









