ঘাটাল: এক সময় উড়িষ্যার আলুর বাজার মানেই ছিল পশ্চিমবঙ্গের আধিপত্য। বাংলার আলু ছাড়া উড়িষ্যার চাহিদা পূরণ হওয়া কার্যত অসম্ভব বলেই মনে করা হত। বিশেষ করে পশ্চিম মেদিনীপুর ও বাঁকুড়া জেলার আলু নিয়মিতভাবে উড়িষ্যা ও ঝাড়খণ্ডে রপ্তানি হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র আমূল বদলে গিয়েছে। বাংলার পরিবর্তে এখন উড়িষ্যার বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে উত্তরপ্রদেশের আলু, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পশ্চিমবঙ্গের কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীদের (potato farmers) জীবিকায়।
কৃষক ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির দাবি, উড়িষ্যা এখন তুলনামূলক কম দামে এবং সহজ পরিবহণ সুবিধার কারণে উত্তরপ্রদেশ থেকে আলু সংগ্রহ করছে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের হিমঘরগুলিতে বিপুল পরিমাণ আলু এখনও অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় মোট ৯০টি হিমঘর রয়েছে। এর মধ্যে ঘাটাল মহকুমার চন্দ্রকোনা এলাকাতেই রয়েছে ২৯টি হিমঘর। চন্দ্রকোনা অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই আলু চাষের জন্য পরিচিত। এখানকার হাজার হাজার কৃষক আলু চাষের উপর নির্ভর করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু চলতি মরশুমে সেই চাষই এখন তাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির রাজ্য সহ-সভাপতি ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সভাপতি মুকুল ঘোষ জানান, এখনও জেলার হিমঘরগুলিতে প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ আলু মজুত রয়েছে। সাধারণত এই সময়ের মধ্যে অধিকাংশ আলু বাইরের রাজ্যে রপ্তানি হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও, এবার সেই প্রবাহ প্রায় থমকে গিয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে আলুর দাম আশঙ্কাজনকভাবে কম। বর্তমানে বাছাই করা গড় আলুর দাম ৯০০ টাকা প্রতি কুইন্টালের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। এই দামে চাষের খরচই উঠে আসছে না। তার উপর হিমঘরের ভাড়া, পরিবহণ খরচ ও শ্রমিকের মজুরি—সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
এক আলু চাষি জানান, “আমরা বাধ্য হয়ে আলু হিমঘরে রেখেছি। কিন্তু ব্যবসায়ীরা আলু তুলতে চাইছেন না। দাম এতটাই কম যে কেউ ঝুঁকি নিতে রাজি নয়।” ব্যবসায়ীরাও একই সুরে কথা বলছেন। তাঁদের মতে, উড়িষ্যায় এখন বাংলার আলুর চাহিদা অনেকটাই কমে গিয়েছে।
মুকুল ঘোষ বলেন, “এখনও হিমঘরে প্রচুর আলু পড়ে রয়েছে। কৃষকরা মার খাচ্ছে। আলু বাইরে রাজ্যে যাচ্ছে না। উড়িষ্যায় এখন কাঁচা আলুর জোগান দিচ্ছে উত্তরপ্রদেশ। ফলে বাংলার আলু প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে।” তাঁর দাবি, আগে যে পরিমাণ আলু উড়িষ্যায় যেত, বর্তমানে তা অনেকটাই কম।
উত্তরপ্রদেশ থেকে কম দামে এবং তুলনামূলক দ্রুত পরিবহণ ব্যবস্থায় আলু পৌঁছে যাওয়ায় উড়িষ্যার ব্যবসায়ীরা সেদিকেই ঝুঁকছেন। এর ফলে বাংলার আলু বাজার হারানোর মুখে। হিমঘরে মজুত থাকা এই আলুর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও কার্যকর হস্তক্ষেপ চোখে পড়েনি। কৃষকদের দাবি, অবিলম্বে বিকল্প বাজার খোঁজা, রপ্তানি সহায়তা এবং ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করা না হলে আগামী মরশুমে আলু চাষে বড়সড় ধস নামতে পারে।
