
বিশ্বের খাদ্য মানচিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরল ২০২৫ সালে। চাল উৎপাদনে বহুদিনের শীর্ষস্থানাধিকারী চিনকে পিছনে ফেলে প্রথম স্থানে উঠে এল ভারত (India rice production)। মার্কিন কৃষি দপ্তর (USDA)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের মোট চাল উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৫০.১৮ মিলিয়ন টন, যেখানে চিনের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ১৪৫.২৮ মিলিয়ন টন। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যাগত সাফল্য নয়, বরং ভারতীয় কৃষির গঠনগত পরিবর্তন ও নীতিগত দিকনির্দেশনার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান এই সাফল্যের কথা ঘোষণা করে জানান, উচ্চ ফলনশীল ধানবীজের ব্যাপক ব্যবহার, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসার এবং চাষের আওতা বাড়ানোর ফলেই এই উৎপাদন বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, পঞ্জাব, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্যগুলিতে ধানচাষে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জলসেচ ব্যবস্থার উন্নতি, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং সরকারি সহায়তা প্রকল্পগুলিও এই বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
ভারতের মোট কৃষি উৎপাদন ২০২৫ সালে যেখানে প্রায় ৩২৭ মিলিয়ন টন, তার মধ্যে চালের অবদান প্রায় ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চাল এখনো প্রধান স্তম্ভ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার চাপের মধ্যেও এই উৎপাদন বৃদ্ধি ভারতকে স্বনির্ভরতার দিকে আরও একধাপ এগিয়ে দিল বলে মত অর্থনীতিবিদদের একাংশের।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ২০২৩ সাল থেকে বিভিন্ন ধরনের চাল রপ্তানিতে ভারত সরকার নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। বিশ্ববাজারে দাম নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখাই ছিল এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য। তবুও উৎপাদনের নিরিখে শীর্ষে উঠে আসা প্রমাণ করে যে, রপ্তানি কমলেও কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কাঠামো শক্তিশালী হয়েছে।
তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি উঠছে একাধিক প্রশ্ন ও উদ্বেগ। সামাজিক মাধ্যমে ও বিশেষজ্ঞ মহলে অনেকেই মনে করছেন, কাঁচা উৎপাদনের পরিমাণ বাড়লেও তার পরিবেশগত মূল্য চুকাতে হতে পারে। ধান একটি জলখরচা ফসল—অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহার ভবিষ্যতে জলসংকট বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন একফসলি চাষ মাটির উর্বরতা নষ্ট করার ঝুঁকিও তৈরি করছে। তাই শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, টেকসই কৃষি পদ্ধতির দিকে নজর দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল কৃষকের লাভ। উৎপাদন বাড়লেও যদি ন্যায্য মূল্য, দক্ষ সরবরাহ শৃঙ্খল ও বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার না থাকে, তাহলে কৃষকের আর্থিক অবস্থার বড় পরিবর্তন হয় না। অনেকেই তাই প্রিমিয়াম ও সুগন্ধি ধানের জাত, মূল্য সংযোজন, প্রক্রিয়াকরণ শিল্প এবং আধুনিক গুদামজাতকরণের উপর জোর দেওয়ার কথা বলছেন। এতে একদিকে যেমন কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে জল ও মাটির উপর চাপও তুলনামূলকভাবে কমানো সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, চাল উৎপাদনে চিনকে ছাপিয়ে শীর্ষে ওঠা ভারতের জন্য নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। তবে এই সাফল্যকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে পরিমাণের পাশাপাশি গুণমান, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং কৃষকের কল্যাণ—এই তিনটি দিককেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তবেই বিশ্বের চালের ভাণ্ডারে ভারতের নেতৃত্ব সত্যিকারের অর্থে টেকসই ও অর্থবহ হয়ে উঠবে।










