কলকাতা: বাংলার ফুটবলে (Bengal Football) প্রাক্তন তারকাদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। এক সময় যাঁদের পায়ে ভর করে গ্যালারি ভরত, যাঁদের নামেই উত্তাল হত কলকাতার ময়দান, সেই কিংবদন্তিরা আজ কতটা যুক্ত বাংলার ফুটবল উন্নয়নে ?। মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট এবং ইস্টবেঙ্গল এফসি-এর মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোর ইতিহাসে একাধিক প্রাক্তন তারকার নাম জড়িয়ে রয়েছে। সুব্রত ভট্টাচার্য, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, কৃষাণু দে কিংবা বাইচুং ভুটিয়া, এঁদের অবদান বাংলা তো বটেই, ভারতীয় ফুটবলকেই সমৃদ্ধ করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান কি বর্তমান প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছচ্ছে? ময়দানের একাংশের মতে, প্রাক্তন তারকাদের ব্যবহার যথেষ্ট হচ্ছে না। অনেক কিংবদন্তিই আজ ক্লাব প্রশাসন বা কোচিং ব্যবস্থার বাইরে। ফলে তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা মাঠে বা তরুণ ফুটবলারদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিচ্ছিন্নতাই বাংলার ফুটবলের উন্নয়নের পথে অন্যতম বড় বাধা। যদিও সম্পূর্ণ ছবি একপাক্ষিক নয়। যেমন বাইচুং ভুটিয়া নিজস্ব একাডেমি গড়ে তরুণদের তুলে আনার কাজে যুক্ত রয়েছেন। একইভাবে সুব্রত ভট্টাচার্য-এর মতো প্রাক্তন ফুটবলাররা সময় সময় কোচিং বা পরামর্শদাতার ভূমিকায় দেখা দিয়েছেন। কিন্তু সংখ্যার বিচারে এই উদ্যোগ এখনও সীমিত বলেই মত অনেকের।
সমস্যার আরেকটি দিক হল আধুনিক ফুটবলের পরিবর্তিত কাঠামো। আইএসএল আগমনের পর ফুটবলে কর্পোরেট প্রভাব বেড়েছে, বিদেশি কোচ ও স্টাফদের আধিপত্যও স্পষ্ট। এই পরিস্থিতিতে অনেক সময় প্রাক্তন দেশীয় তারকারা নিজেদের জায়গা খুঁজে পান না। ক্লাবগুলিও আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতার দিকে ঝুঁকছে বেশি, ফলে স্থানীয় কিংবদন্তিরা অনেক সময় উপেক্ষিত হচ্ছেন। তবে ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ, বাংলার ফুটবলের নিজস্ব সংস্কৃতি, আবেগ ও খেলার ধরণ বুঝতে প্রাক্তন তারকাদের ভূমিকা অপরিহার্য। তাঁদের অভিজ্ঞতা তরুণদের মানসিক দৃঢ়তা, ম্যাচ পরিস্থিতি সামলানো এবং ক্লাবের ঐতিহ্য বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক হতে পারে।
তরুণ ফুটবলারদের মধ্যেও এই চাহিদা রয়েছে। প্রাক্তন ফুটবলার মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যর কথায় “বাংলার ফুটবলের উন্নতির জন্য প্রাক্তন ফুটবলারদের আরও বেশি করে যুক্ত করা জরুরি। আমরা মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শেখাতে পারি। শুধু বাইরে রেখে দিলে চলবে না, তরুণদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, তবেই ভবিষ্যৎ শক্তিশালী হবে।”
ফলে এখন প্রয়োজন সুসংগঠিত পরিকল্পনার। ক্লাবগুলোর উচিত প্রাক্তন তারকাদের বিভিন্ন ভূমিকায় যুক্ত করা—হোক তা একাডেমি কোচিং, টেকনিক্যাল ডিরেক্টর বা মেন্টর হিসেবে। এতে একদিকে যেমন তাঁদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে, তেমনই তরুণ প্রজন্মও পাবে সঠিক দিশা। সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলার ফুটবলের উন্নয়নে প্রাক্তন তারকাদের ভূমিকা এখনও অপরিসীম। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। উত্তর খুঁজতে হলে এখনই উদ্যোগী হতে হবে ক্লাব ও প্রশাসনকে। না হলে ইতিহাসের গৌরব শুধু স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।




















