কলকাতা: বাংলার ময়দান (Bengal Football) একসময় ফুটবলের প্রাণকেন্দ্র ছিল। মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল-এর ডার্বি মানেই আবেগের বিস্ফোরণ। কিন্তু এখন সেই গৌরবের শহরেই প্রশ্ন—কেরালা ও গোয়া এমনকি নর্থইস্ট এর বিভিন্ন রাজ্য যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলা কেন পিছিয়ে?
ভারতীয় ফুটবলের দিকে তাকালে দেখা যায়, আজ জাতীয় দলের মুখ হয়ে উঠেছেন সুনিল ছেত্রী (Sunil Chhetri)। গোয়া থেকে উঠে আসা ব্র্যান্ডন ফার্নান্দেজ বা কেরালার সাহাল আব্দুল সামাদ নিয়মিত বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করছেন। কিন্তু বাংলা থেকে সেই ধারাবাহিকতায় নতুন মুখ খুব কমই উঠে আসছে। একসময় যেখানে বাংলার ফুটবলাররাই জাতীয় দলে দাপট দেখাতেন, এখন সেই জায়গা অনেকটাই ফাঁকা। কারণ খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসে গ্রাসরুট সমস্যা। কেরালা ও গোয়ায় ছোট থেকেই ফুটবলার তৈরির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে। বাংলায় প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও সেই প্রতিভা হারিয়ে যাচ্ছে মাঝপথেই। অনেক তরুণ ফুটবলার, যেমন প্রীতম কোটাল বা প্রবীর দাস, যাঁরা এখনও আইএসএল এ খেলছেন, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম কোথায়? দ্বিতীয়ত, সুযোগের অভাব স্পষ্ট।
আইএসএলে বিদেশি ফুটবলারদের উপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে স্থানীয় ছেলেরা অনেক সময় বেঞ্চে বসেই মরশুম কাটাচ্ছে। কেরালা বা গোয়ার ক্লাবগুলো নিজেদের রাজ্যের ফুটবলারদের বেশি সুযোগ দেয়, কিন্তু বাংলায় সেই প্রবণতা কম। ইস্ট বেঙ্গল-এর শীর্ষকর্তা দেবব্রত সরকার এই প্রসঙ্গে বলেন, “বাংলা ফুটবল পিছিয়ে পড়ছে—এটা অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। কিন্তু এর জন্য এককভাবে কোনো ক্লাবকে দায়ী করা ঠিক নয়। কেরালা বা গোয়া যেভাবে গ্রাসরুট স্তরে কাজ করছে, সেই ধারাবাহিকতা বাংলায় অনেকটাই কমে গেছে।”
ইনফ্রাস্ট্রাকচারের কথাও উঠছে বারবার। সল্টলেক স্টেডিয়ামের এর মতো বড় স্টেডিয়াম থাকলেও, নিচুতলার প্রশিক্ষণ বা ফিটনেস কালচার এখনও উন্নত হয়নি। আধুনিক ফুটবলে যেখানে ফিটনেস ও ডায়েট বড় ভূমিকা নেয়, সেখানে বাংলার অনেক ক্লাব এখনও পিছিয়ে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মানসিকতায়। এখন অনেক তরুণই ফুটবলকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে ভয় পাচ্ছে। পরিবারের চাপ, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, সব মিলিয়ে অনেক স্বপ্ন শুরু হওয়ার আগেই থেমে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, কেরালা ও গোয়ায় ফুটবল এখনও সম্মানের পেশা। তবুও আশার আলো পুরো নিভে যায়নি। এখনও ডার্বির দিন শহর থেমে যায়, এখনও গ্যালারিতে আবেগ উথলে ওঠে। মোহনবাগান সভাপতি দেবাশীষ দত্তের কথায় ” “ময়দানে এখনও ছেলেদের চোখে স্বপ্ন দেখি, কিন্তু সেই স্বপ্ন অনেক সময় পথ হারাচ্ছে। আমাদের আরও দায়িত্ব নিতে হবে। ছোটদের পাশে দাঁড়াতে হবে, সুযোগ দিতে হবে। শুধু ইতিহাসে বাঁচলে হবে না—নতুন প্রজন্মকে নিয়ে আবার লড়াই শুরু করতে হবে, তবেই বাংলা ফুটবল সত্যি ঘুরে দাঁড়াবে।” হয়তো নতুন কোনো ছেলে, নতুন কোনো গল্প আবার বদলে দিতে পারে ছবিটা। কিন্তু তার জন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা, সুযোগ আর বিশ্বাস—যাতে আবার কোনো একদিন, বাংলার মাটিতেই তৈরি হয় পরবর্তী সুনীল ছেত্রী।




















