কৃষকদের সমান সুবিধার আশায় প্রান্তিক চা চাষিরা

দেশের ছোট চা চাষিরা (Small Tea Growers বা STGs) আশা প্রকাশ করেছেন যে, তাদের কৃষকদের সমান মর্যাদা দেওয়া হবে এবং তারা কৃষি ক্ষেত্রের জন্য সরকারের…

tea growers in west bengal

দেশের ছোট চা চাষিরা (Small Tea Growers বা STGs) আশা প্রকাশ করেছেন যে, তাদের কৃষকদের সমান মর্যাদা দেওয়া হবে এবং তারা কৃষি ক্ষেত্রের জন্য সরকারের বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। সোমবার কলকাতায় এই কথা জানিয়েছেন কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া স্মল টি গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (CISTA)-এর সভাপতি বিজয় গোপাল চক্রবর্তী। দেশে প্রায় ২.৫ লক্ষ ছোট চা চাষি রয়েছেন, যারা মোট চা উৎপাদনের ৫১ শতাংশের বেশি অবদান রাখেন, অথচ তাদের অধিকাংশেরই এক একরেরও কম জমি রয়েছে।

CISTA-র তরফে জানানো হয়েছে, সংসদের বাণিজ্য বিষয়ক স্থায়ী কমিটির ১৮৮তম রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ছোট চা চাষিদের কৃষকদের সমান স্তরে বিবেচনা করা উচিত। এই কমিটি মনে করে, তাদের প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা (PMFBY), প্রধানমন্ত্রী কৃষি সিঞ্চাই যোজনা (PMKSY)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কৃষি কল্যাণ প্রকল্পের আওতায় আনা প্রয়োজন। কমিটি সুপারিশ করেছে যে, এই প্রস্তাবগুলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে STG-দের জন্য এই সুবিধাগুলো প্রসারিত করা হোক।

   

ভারতের চা শিল্পে ছোট চা চাষিদের অবদান অপরিসীম। মোট উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি তাদের হাত থেকে আসে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যগুলোতে। তবে, এই চাষিদের বেশিরভাগই অত্যন্ত ছোট জমির মালিক। তাদের কাছে আধুনিক কৃষি সরঞ্জাম, সেচ ব্যবস্থা বা ফসলের ক্ষতির সময় আর্থিক সুরক্ষার মতো সুবিধা নেই। CISTA-র সভাপতি বিজয় গোপাল চক্রবর্তী বলেন, “আমরা যদি কৃষকদের মতো সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাই, তাহলে আমাদের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত হবে। আমরা চাই আমাদের পরিশ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হোক।”

Advertisements

প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা (PMFBY) কৃষকদের ফসলের ক্ষতির ক্ষেত্রে আর্থিক সুরক্ষা দেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কীটপতঙ্গ বা রোগের কারণে ফসল নষ্ট হলে এই প্রকল্প কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেয়। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী কৃষি সিঞ্চাই যোজনা (PMKSY) কৃষকদের জন্য আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, যেমন ড্রিপ ও স্প্রিংকলার সেচের জন্য ভর্তুকি প্রদান করে। কিন্তু STG-রা এখনও এই সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত। চক্রবর্তী বলেন, “আমাদেরও ফসল হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। আমাদেরও সেচের প্রয়োজন। তাহলে কেন আমরা এই প্রকল্পগুলোর আওতায় আসতে পারব না?”

পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ারের মতো এলাকায় হাজার হাজার ছোট চা চাষি রয়েছেন। এই অঞ্চলের চা শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এই চাষিরা প্রায়ই তাদের উৎপাদিত সবুজ চা পাতার জন্য ন্যায্য দাম পান না। বাঙালি চা চাষিদের মধ্যে এই খবরে আশার আলো দেখা গেছে। জলপাইগুড়ির একজন STG বলেন, “যদি আমরা কৃষকদের মতো সুবিধা পাই, তাহলে আমাদের জীবন অনেক সহজ হবে। আমরা চাই আমাদের পরিশ্রমের ফল আমরা নিজেরাই ভোগ করতে পারি।”

সংসদীয় কমিটির রিপোর্টে STG-দের সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, চা চাষিরা কৃষি ক্ষেত্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাদের উন্নতির জন্য সরকারি সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কমিটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। CISTA-ও এই সুপারিশকে স্বাগত জানিয়েছে এবং বলেছে, “এটি আমাদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন। আমরা আশা করি সরকার এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করবে।”

STG-দের এই প্রকল্পগুলোর আওতায় আনা হলে তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। PMFBY-এর মাধ্যমে তারা ফসলের ক্ষতির সময় আর্থিক সাহায্য পাবেন, আর PMKSY তাদের জমিতে সেচ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাবে। এছাড়া, কিষাণ ক্রেডিট কার্ড (KCC) এবং প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি (PM-KISAN)-এর মতো প্রকল্পগুলোও তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতা দেবে। বিজয় গোপাল চক্রবর্তী বলেন, “আমরা চাই আমাদের পরিচয় শুধু চা চাষি হিসেবে না থেকে কৃষক হিসেবেও গণ্য হোক। এটি আমাদের ন্যায্য অধিকার।”

ছোট চা চাষিদের এই আশা এবং CISTA-র প্রচেষ্টা ভারতের চা শিল্পে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের চা চাষিরাও এই উদ্যোগে সমর্থন জানিয়েছেন। সরকার যদি সংসদীয় কমিটির সুপারিশ মেনে STG-দের কৃষকদের সমান সুবিধা দেয়, তাহলে এটি দেশের অর্থনীতি ও গ্রামীণ উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। আপাতত, এই ২.৫ লক্ষ চা চাষি তাদের পরিশ্রমের স্বীকৃতি ও সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছেন।