চাঁদ কি অভিমান করে দূরে সরে যাচ্ছে? প্রতি বছর পৃথিবী থেকে দূরত্ব কতটা বাড়ছে জানুন

Moon Drifting Away From Earth: আপনি কি জানেন যে আমাদের প্রিয় চাঁদটি নীরবে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, চাঁদ প্রতি…

Moon

Moon Drifting Away From Earth: আপনি কি জানেন যে আমাদের প্রিয় চাঁদটি নীরবে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, চাঁদ প্রতি বছর পৃথিবী থেকে প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার করে দূরে সরে যাচ্ছে। মানুষের আয়ুষ্কালের তুলনায় এই দূরত্ব হয়তো নগণ্য মনে হতে পারে, কিন্তু লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এর প্রভাব পৃথিবীর ওপর গভীর ও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে। চাঁদ কেন দূরে সরে যাচ্ছে এবং এটি কীভাবে আমাদের গ্রহের ভবিষ্যৎকে বদলে দেবে?

বিজ্ঞানীদের সুনির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চাঁদ প্রতি বছর ৩.৮৩ সেন্টিমিটার হারে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। মানুষের হাতের নখ যে গতিতে বৃদ্ধি পায়, ঠিক সেই একই গতিতে এই দূরত্ব বাড়ছে। ৭০ থেকে ৮০ বছরের মানুষের গড় আয়ুষ্কালে এই দূরত্বের পরিবর্তন মাত্র ৩ মিটার হলেও, লক্ষ লক্ষ বছরের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত বিশাল।

Advertisements

চাঁদ যে দূরে সরে যাচ্ছে, তা আমরা কীভাবে জানলাম?

১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে, অ্যাপোলো অভিযানের অংশ হিসেবে নীল আর্মস্ট্রং ও অন্যান্য নভোচারী যখন চাঁদে গিয়েছিলেন, তখন তাঁরা সেখানে বিশেষ ধরনের কিছু আয়না রেখে এসেছিলেন। বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে ওই আয়নাগুলোর ওপর লেজার রশ্মি ফেলেন এবং আলোটি ফিরে আসতে কত সময় লাগে, তা পরিমাপ করেন। এই পদ্ধতির মাধ্যমেই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে জানা গেছে যে, চাঁদ ক্রমশ আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

চাঁদ কেন দূরে সরে যাচ্ছে?

এর মূল কারণ হলো সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা। চাঁদের মহাকর্ষ বল পৃথিবীর জলরাশিকে নিজের দিকে টেনে আনে। একই সময়ে পৃথিবী তার অক্ষের ওপর দ্রুত আবর্তন করে। এই আবর্তনের ফলে সমুদ্রের জলরাশি চাঁদের অবস্থানের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে যায়। সরে আসা এই জলরাশি চাঁদের ওপর একটি আকর্ষণ বল প্রয়োগ করে এবং এতে সামান্য পরিমাণ শক্তি স্থানান্তর করে। এই শক্তির কারণেই চাঁদ অপেক্ষাকৃত উচ্চতর কক্ষপথে সরে যায় এবং ধীরে ধীরে আরও দূরে সরে যেতে থাকে।

এর ফলে পৃথিবীর ওপর কী প্রভাব পড়বে?

১. আমাদের দিনগুলো দীর্ঘ হতে শুরু করবে: চাঁদ দূরে সরে যাওয়ার সাথে সাথে এটি পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি কমিয়ে দিচ্ছে। এক বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে দিনের দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ১৯ ঘণ্টা। বর্তমানে দিনের দৈর্ঘ্য ২৪ ঘণ্টা। ভবিষ্যতে দিনগুলো আরও দীর্ঘ হবে, কারণ পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি ক্রমশ ধীর হয়ে আসছে।

২. পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে: বর্তমানে আকাশে চাঁদ ও সূর্যকে একই আকারের বলে মনে হয়। এ কারণেই চাঁদ যখন সূর্যের সামনে দিয়ে যায়, তখন তা সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলে। কিন্তু চাঁদ ক্রমশ দূরে সরে যাওয়ার ফলে আকাশে একে আকারে ছোট মনে হতে শুরু করবে। প্রায় ৬০ কোটি বছর পর চাঁদ এতটাই ছোট দেখাবে যে, তা আর সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে পারবে না। অর্থাৎ, পৃথিবী থেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের ঘটনাটি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

৩. সমুদ্রের ঢেউ দুর্বল হয়ে পড়বে: চাঁদের দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে পৃথিবীর ওপর এর মহাকর্ষীয় টানও দুর্বল হয়ে পড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আমাদের মহাসাগরগুলোর ওপর; সমুদ্রের বিশাল ঢেউ এবং জোয়ার-ভাটার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র এবং সামুদ্রিক প্রাণিকুলের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

চাঁদের দূরে সরে যাওয়া কোনো নতুন ঘটনা নয়; গত ৪৫০ কোটি বছর ধরে এমনটাই ঘটে চলেছে। পৃথিবী যতদিন আবর্তন করতে থাকবে, চাঁদও ততদিন ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে থাকবে। যদিও এর প্রভাব হয়তো আমরা আজ দেখতে পাচ্ছি না, তবে লক্ষ লক্ষ বছর পর আমাদের পৃথিবীর রূপ সম্পূর্ণ বদলে যাবে।