কলকাতা: ভারতে নারীদের কর্মসংস্থান নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক সরকারি সমীক্ষা সেই আলোচনাকে নতুন দিশা দেখিয়েছে। প্রশ্নটা শুধু কেন নারীরা কর্মক্ষেত্রে কম রয়েছেন তা নয়, কেন এখনও সন্তান লালন-পালন ও পরিবারের যত্নের দায় প্রায় সম্পূর্ণভাবে নারীদের কাঁধেই?
ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল অফিস (NSO)-এর ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ ত্রৈমাসিক সমীক্ষা বলছে, শহরাঞ্চলের শ্রমবাজারের বাইরে থাকা ৬৮.৭ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, সন্তানের দেখাশোনা, পরিবারের সদস্যদের পরিচর্যা এবং গৃহস্থালির কাজের কারণেই তাঁরা চাকরি করছেন না। বিপরীতে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩.৮ শতাংশ।
সমীক্ষাটি দেশের ৩৪টি বড় শহরের ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সি শ্রমবাজারের বাইরে থাকা মানুষের উপর পরিচালিত হয়েছে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রের বাইরে থাকা নারীদের মধ্যে
• ৬৮.৭% বলেছেন সন্তান ও পরিবারের যত্নের দায়িত্বই প্রধান কারণ।
• ৮.৩% পড়াশোনা করছেন।
• ৩.৪% অসুস্থতা বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কথা বলেছেন।
• ৩.১% উপযুক্ত চাকরির অপেক্ষায় রয়েছেন।
• ২.২% পারিবারিক বিধিনিষেধের কথা উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের খুব কম অংশই পরিবারের পরিচর্যার কারণে কর্মজীবনের বাইরে রয়েছেন। অধিকাংশই পড়াশোনা, অসুস্থতা বা উপযুক্ত চাকরির অপেক্ষাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিসংখ্যান শুধু কর্মসংস্থানের নয়, বরং ভারতীয় সমাজে অবৈতনিক পরিচর্যা (Unpaid Care Work)-এর অসম বণ্টনের প্রতিফলন।
Also Read | জুন মাসে ৫.১৪ বিলিয়নের রুশ তেল কিনে রেকর্ড মোদী সরকারের
সন্তানের যত্ন নেওয়া মানে শুধু খাওয়ানো বা স্কুলে পৌঁছে দেওয়া নয়। চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া, টিকাকরণের সময়সূচি মনে রাখা, স্কুলের বৈঠকে উপস্থিত থাকা, অসুস্থ সন্তানের পাশে থাকা, ছুটির সময় দেখাশোনার ব্যবস্থা করা, এসবই প্রতিদিনের অবিরাম দায়িত্ব। অথচ এই শ্রমের কোনও আর্থিক মূল্যায়ন হয় না।
অনেক নারী মাতৃত্বকালীন ছুটি বা সন্তানের ছোটবেলার জন্য সাময়িকভাবে চাকরি ছাড়লেও পরে কর্মজীবনে ফিরে আসা সহজ হয় না। দীর্ঘ বিরতির ফলে দক্ষতা হালনাগাদ করা, আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া এবং নতুন চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি শিশু পরিচর্যার বাড়তি খরচও অনেক সময় চাকরিতে ফেরার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
Also Read | সরকারি অনুমোদন ছাড়াই কলকাতায় কিছু রুটে বাড়ছে বেসরকারি বাসভাড়া
সমীক্ষায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু সন্তান নয়, বহু নারী বৃদ্ধ বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি বা অসুস্থ পরিবারের সদস্যদের পরিচর্যার দায়িত্বও বহন করেন। ফলে তাঁদের উপর অবৈতনিক পরিচর্যার চাপ আরও বেড়ে যায়।
শহরভেদেও এই প্রবণতায় বড় পার্থক্য দেখা গেছে। পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ায় কর্মক্ষেত্রের বাইরে থাকা নারীদের মধ্যে ৮৫.৪ শতাংশ বলেছেন, সন্তান ও পরিবারের দায়িত্বই তাঁদের কাজ না করার প্রধান কারণ। এই তালিকায় হাওড়ার পরেই রয়েছে সুরাট (৮৩.৪%), ভোপাল (৮১.৫%) এবং জবলপুর (৮১.২%)।
অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে কম হার দেখা গেছে কোয়েম্বাটুর (৩৯.৮%), আগ্রা (৪০.৪%), অমৃতসর (৪৫.৮%) এবং মিরাটে (৪৮.১%)।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরভেদে এই পার্থক্যের পেছনে শিশু পরিচর্যার পরিকাঠামো, কর্মসংস্থানের সুযোগ, যাতায়াত ব্যবস্থা এবং পারিবারিক সহায়তার মতো বিভিন্ন স্থানীয় কারণ কাজ করতে পারে।
Also Read | অসামান্য সাফল্য! বাংলাদেশকে পিছনে ফেলে ব্রিটেনের মাটিতে ৩৫% সস্তা ভারতীয় পোশাক
সমীক্ষার মূল বার্তা স্পষ্ট, ভারতের শহুরে নারীদের কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় বাধা যোগ্যতার অভাব নয়, বরং পরিবারের পরিচর্যার অসম দায়িত্ব। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর যত্নকে শুধুমাত্র নারীর দায়িত্ব হিসেবে না দেখে পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সরকারি নীতির যৌথ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা না হলে নারীদের কর্মসংস্থানে সমতা আনা কঠিনই থেকে যাবে।




