কলকাতা: পাকিস্তান ও চিন অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC)-এর পর এবার ভারতের পূর্ব সীমান্তে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান আরও মজবুত করতে চাইছে বেজিং। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেজিং সফরের সময় চিন ও বাংলাদেশের মধ্যে মিয়ানমার হয়ে একটি নতুন ট্রান্স-ন্যাশনাল অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির প্রস্তাব উঠে এসেছে। কৌশলগতভাবে ভারতের জন্য এই প্রস্তাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে চিন বঙ্গোপসাগরের ওপর সরাসরি নজরদারি এবং মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে। (China Bangladesh Myanmar Economic Corridor)
করিডোরের রূপরেখা ও উদ্দেশ্য
বেজিংয়ের প্রস্তাবিত এই নতুন রুটের সূচনা হবে চিনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং থেকে। এটি মিয়ানমারের মান্দালয় হয়ে দুই ভাগে বিভক্ত হবে, একটি অংশ ইয়াঙ্গন ও কিয়াউকপিউ (Kyaukphyu) বন্দরের দিকে যাবে, অন্যটি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সঙ্গে সড়ক ও রেলপথের মাধ্যমে যুক্ত হবে। চিনের লক্ষ্য, এই করিডোরের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজার এবং বঙ্গোপসাগরে নিজেদের বাণিজ্যিক ও সামরিক উপস্থিতি সুনিশ্চিত করা।
ভারতের কাছে উদ্বেগের কারণ
ভারত বরাবরই চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর বিরোধী, কারণ এর একটি অংশ বিতর্কিত গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলের ওপর দিয়ে গিয়েছে। নতুন এই করিডোর ভারতের পূর্ব সীমান্তে বেজিংয়ের প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকীকরণে চিনের আগ্রহ ভারতের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে মোংলা বন্দরে যে অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির কথা ছিল, যেখানে ভারতের যুক্ত হওয়ার কথা ছিল, সেখানে বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসন চিনকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় ভারতের দীর্ঘমেয়াদী কৌশল ধাক্কা খেয়েছে।
বাস্তবতার কাঁটা ও চ্যালেঞ্জ
এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের সামনে সবথেকে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মিয়ানমারের অস্থির পরিস্থিতি। যে রুটে এই করিডোর তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তার অধিকাংশ অঞ্চলই বর্তমানে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রাখাইন প্রদেশসহ বেশ কিছু অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সেখানে বড় ধরনের পরিকাঠামো নির্মাণ কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। অতীতে ভারত-চিন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ (BCIM) করিডোরের প্রস্তাব উঠলেও, ভারতের অনাগ্রহ ও ভূ-রাজনৈতিক জটিলতায় তা কার্যত স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতামত
প্রতিরক্ষা ও ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চিনের এই সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা নিছক বাণিজ্যিক নয়, বরং এটি চিনের ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের এক দীর্ঘমেয়াদী কৌশল। ওয়াশিংটন ও দিল্লি, উভয়ই এই পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে।
যদিও এই করিডোর এখনও প্রাথমিক প্রস্তাবের স্তরে রয়েছে, তবুও এটি স্পষ্ট যে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের ‘স্ট্র্যাটেজিক ফুটপ্রিন্ট’ বাড়াতে কোনো সুযোগই হাতছাড়া করতে রাজি নয় বেজিং। নতুন এই অর্থনৈতিক করিডোর ভারতের জন্য তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান চিনা প্রভাবের মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জের জন্ম দিল।


