বিট্টু দত্ত, কলকাতা ডেস্ক: ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি আবেগ, ভালোবাসা এবং জীবনের অংশ। আর সেই আবেগের অন্যতম বড় নাম ব্রাজিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটির সমর্থক পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই রয়েছে। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে কেরলে ব্রাজিলের জনপ্রিয়তা এতটাই বেশি যে, বিশ্বকাপ এলেই হলুদ-সবুজ রঙে সেজে ওঠে গোটা রাজ্য। সেই (FIFA World Cup) আবেগেরই এক ব্যতিক্রমী গল্প লিখেছেন কোচির ২৬ বছরের যুবক অক্ষয় কলাপ্পুরাক্কাল।
স্থানীয়ভাবে ‘আচু’ নামে পরিচিত অক্ষয় ছোটবেলা থেকেই ব্রাজিলের অন্ধ ভক্ত। শুধু সমর্থকই নন, তিনি নিজেও ফুটবল খেলতেন এবং ভবিষ্যতে ভালো ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু ২০২২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় তাঁর জীবনে যেন এক ভয়াবহ মোড় নিয়ে আসে। প্রিয় দলের হার মেনে নিতে না পেরে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। আচমকাই স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে অজ্ঞান হয়ে যান। হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধেছে।
সেই ঘটনার পর থেকে দীর্ঘ চার বছর কার্যত শয্যাশায়ী জীবন কাটছে অক্ষয়ের। হাত-পা নাড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তিনি। কথা বলাও সম্ভব ছিল না। শুধুমাত্র চোখের ইশারায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতেন। একসময় মাঠে ছুটে বেড়ানো ছেলেটির জীবন সীমাবদ্ধ হয়ে যায় একটি বিছানার মধ্যে।
এবারের বিশ্বকাপ নতুন করে আশা জাগায় পরিবারের মনে। যদিও প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিরুদ্ধে জয় পায়নি ব্রাজিল, তবু পরের ম্যাচে হাইতির বিরুদ্ধে দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দেয় সেলেকাওরা। ৩-০ গোলে জিতে তারা নিশ্চিত করে রাউন্ড অফ ৩২-এর টিকিট। এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি অক্ষয় যাতে দেখতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করেন তাঁর বন্ধুরা। বাড়ির সামনে বড় পর্দায় ম্যাচ দেখার আয়োজন করা হয়।
ম্যাচ চলাকালীনই ঘটে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। দীর্ঘ চার বছর পর প্রথমবারের মতো অক্ষয়ের মুখে হাসি দেখা যায়। শুধু তাই নয়, তাঁর শরীরেও কিছু ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেন পরিবারের সদস্যরা। এতদিন যিনি প্রায় নিস্তব্ধ ছিলেন, ব্রাজিলের জয়ে তাঁর মুখের সেই হাসি নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাচ্ছে পরিবারকে।
অক্ষয়ের বাবা-মা এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, এই পরিবর্তন হয়তো তাঁদের ছেলের সুস্থতার পথে প্রথম ধাপ। তাঁদের আশা, যদি ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতে ষষ্ঠবারের মতো শিরোপা ঘরে তোলে, তাহলে হয়তো অক্ষয় আরও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই পরিবর্তনের পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে, কিন্তু পরিবারের কাছে এটি যেন এক অলৌকিক মুহূর্ত।
এ ধরনের ঘটনা অবশ্য ফুটবল দুনিয়ায় একেবারেই নজিরবিহীন নয়। ২০২০ সালে ইতালির কিংবদন্তি ফুটবলার ফ্রান্সেসকো তোত্তির একটি ভিডিওবার্তা পাওয়ার পর দীর্ঘদিন কোমায় থাকা এক মহিলা ধীরে ধীরে সাড়া দিতে শুরু করেছিলেন। সেই ঘটনাও বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল।
অক্ষয়ের গল্প আবারও মনে করিয়ে দেয়, খেলাধুলা কখনও কখনও শুধু বিনোদন নয়; এটি মানুষের মনে আশা জাগায়, লড়াই করার শক্তি দেয় এবং অসম্ভবকেও সম্ভব বলে বিশ্বাস করতে শেখায়। ব্রাজিলের একটি জয় হয়তো চিকিৎসার বিকল্প নয়, কিন্তু সেই জয় একজন অসুস্থ তরুণের মুখে চার বছর পর হাসি ফিরিয়ে দিয়েছে। আর সেই হাসিই আজ তাঁর পরিবারকে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে—একদিন হয়তো অক্ষয় আবার নিজের পায়ে দাঁড়াবেন।



