কলকাতা: বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের ঠিক এক মাস পর, চরম কোন্দল তৃণমূল কংগ্রেসে৷ এবার বড়সড় সাংগঠনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে কড়া বার্তা দিলেন সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটের পর থেকেই বাংলার অলিতে-গলিতে এবং দলের অন্দরে সমস্ত ক্ষোভের তির ধেয়ে যাচ্ছিল নেত্রীর ভাইপো তথা দলের অলিখিত ‘নম্বর টু’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে। এই আবহে শুক্রবার দলের কাঠামোয় এক সুচতুর ‘মধ্যপন্থা’ নিলেন মমতা। একদিকে যেমন অভিষেককে তাঁর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে ধরে রাখা হল, তেমনই সমীকরণ বজায় রাখতে তাঁর একচ্ছত্র ক্ষমতায় বড়সড় রাশ টানলেন দলনেত্রী। (Mamata Banerjee clipped Abhishek’s wings)
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্বপদে রাখা হলেও, তাঁর একক কর্তৃত্ব খর্ব করতে রাজ্যসভার দুই প্রবীণ সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দোলা সেনকে দলের ‘যৌথ সম্পাদক’ পদে বসিয়েছেন মমতা। দলগতভাবে একে অভিষেকের ‘সহযোগিতা’ করার দলীয় পদক্ষেপ বলা হলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে ভাইপোর ডানা ছাঁটার জন্য নেত্রীর তৈরি করা এক নিখুঁত ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’। ডেরেক ও দোলা দুজনেই সরাসরি মমতার অত্যন্ত অনুগত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ করে দোলা সেনের অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি জাতীয় সাংগঠনিক স্তরে মমতার ‘চোখ ও কান’ হিসেবে কাজ করবেন। এর পাশাপাশি ছাত্র সংগঠনেও কোপ মেরে অভিষেকের ঘনিষ্ঠ তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যকে সরিয়ে প্রিয়াঙ্কা অধিকারীকে সভাপতি করা হয়েছে।
মমতার এই চালের পরেও অবশ্য সুর নরম করেনি বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী। দলের ৫৮ জন বিধায়ক ইতিমধ্যেই দলের পরিষদীয় উইং নিজেদের দখলে নিয়েছেন। বিক্ষুব্ধ শিবিরের স্পষ্ট বক্তব্য, যে ব্যক্তির জেরে নিচু স্তরে দলের এই ধস নামল, তাঁর ওপর আবার ভরসা দেখানো মানে মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো। এই নজিরবিহীন বিদ্রোহের মূলে রয়েছে একটি চিঠিতে বিধায়কদের ‘স্বাচ্ছর জালিয়াতি’র বিতর্ক। অভিযোগ, বিধানসভার স্পিকারের কাছে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার যে প্রস্তাব অভিষেক পাঠিয়েছিলেন, তাতে বহু বিধায়কের সই জাল করা হয়েছিল। এই স্পর্শকাতর ঘটনাটি নিয়ে বর্তমানে সিআইডি (CID) তদন্ত চলছে।
ভোটে বিপর্যয়ের পর তৃণমূলের প্রবীণ নেতাদের বড় অংশ অভিষেকের ‘কর্পোরেট ধাঁচের’ দল পরিচালনা এবং প্রশান্ত কিশোরের সংস্থা ‘আই-প্যাক’ (I-PAC)-এর ওপর চরম বীতশ্রদ্ধ ছিলেন। দলীয় নেতৃত্বের একাংশের ক্ষোভ, আই-প্যাকের ভুল কৌশলের কারণেই নিচু তলার কর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন এবং দলের এই ভরাডুবি হয়েছে। অন্য দিকে, দলের কোনো কোনো নেতার দাবি, অভিষেক তিলে তিলে দলটাকে শেষ করে দিয়েছেন, আর মমতা সব বুঝেও নিরুপায় ছিলেন। প্রার্থী চয়ন থেকে শুরু করে বুথ সামলানো, সব কিছুতেই ছিল অভিষেকের একক কর্তৃত্ব। প্রবীণ নেতাদের একটা বড় অংশ অভিষেকের এই সমান্তরাল সরকার চালানোয় বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন।
কিছুদিন আগেই সোনারপুরে ভোট-পরবর্তী হিংসায় মৃত এক কর্মীর বাড়ি যাওয়ার পথে সাধারণ মানুষের নজিরবিহীন ক্ষোভের মুখে পড়েন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে ডিম ও পাথর বৃষ্টি করা হয়, যার জেরে তাঁকে হাসপাতালেও যেতে হয়েছিল। বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিজেপির দাবি, এই জনরোষ আসলে তৃণমূল জমানার হাইওয়ে ও মোড়ে মোড়ে চলা তোলাবাজির বিরুদ্ধে, যা বাংলায় ‘ভাইপো ট্যাক্স’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিজেপি সরকার ইতিমধ্যেই এই তোলাবাজি সিন্ডিকেটগুলির বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দশকের পর দশক ধরে রাজপথে লড়াই করে, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মাধ্যমে তিলে তিলে ‘দিদি’ হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে, অভিষেক কোনও জনভিত্তি ছাড়াই সরাসরি নেত্রীর হাত ধরে দলের একচ্ছত্র ক্ষমতা পেয়ে যান। মুকুল রায় বা শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতারা, যাঁরা দলের জন্য রক্ত-ঘাম দিয়েছিলেন, তাঁরা এই সংস্কৃতি মেনে নিতে পারেননি বলেই সুভেন্দু ২০২০ সালে দল ছাড়েন এবং আজ তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৯৮ সালে দল গঠনের পর থেকে সবচেয়ে বড় অস্তিত্বের সংকটে দাঁড়িয়ে, নিজের রাশ পুনপ্রতিষ্ঠা করতেই মমতার এই মাস্টারস্ট্রোক।



















