কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফের বড়সড় চাঞ্চল্য। (TMC)নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে যে অস্বস্তি ও অসন্তোষের জল্পনা চলছিল, তা এবার প্রকাশ্যে বিস্ফোরণের আকার নিল। দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের তরফে এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিয়ে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের সমস্ত সাংগঠনিক কমিটি ও সহযোগী শাখা সংগঠন ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দলীয় কাঠামোর প্রতিটি স্তরে কার্যত নতুন করে সংগঠন গড়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে চলেছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
৩ জুন দলের অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হ্যান্ডেলে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের সমস্ত কমিটি এবং তার অধীনস্থ সহযোগী সংগঠনগুলি অবিলম্বে বিলুপ্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ, যুব সংগঠন, মহিলা সংগঠন এবং ট্রেড ইউনিয়ন-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শাখা। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, দলের সাংগঠনিক কাঠামোকে নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে এবং কর্মক্ষমতার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হবে।
আরও দেখুনঃ অন্নপূর্ণা প্রকল্প সফল করতে পুরসভার ম্যারাথন বৈঠক
এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বেড়েছে কারণ এর ঠিক আগে দলের অন্দরে বড় ধরনের বিদ্রোহের খবর সামনে আসে। সূত্রের দাবি, অন্তত ৫৮ জন বিধায়ক দলীয় লাইনের বাইরে গিয়ে প্রথমবারের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজেদের পরিষদীয় দলনেতা তথা বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন জানিয়ে বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছে স্বাক্ষর জমা দেন। এই ঘটনাকে অনেকেই তৃণমূলের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিদ্রোহের পরই দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নামার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই প্রেক্ষাপটেই সমস্ত কমিটি ভেঙে দেওয়ার পদক্ষেপকে কড়া সাংগঠনিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নেতৃত্ব স্পষ্ট করতে চাইছে যে দলের নিয়ন্ত্রণ এখনও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাতেই রয়েছে এবং ভবিষ্যতে নতুন কাঠামো গঠনের আগে প্রত্যেকের ভূমিকা ও কার্যকারিতা খতিয়ে দেখা হবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে স্বাভাবিকভাবেই দলের বিভিন্ন পদাধিকারীদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। যেহেতু সংগঠনের সমস্ত কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে, তাই পূর্ববর্তী সাংগঠনিক পদগুলিও আপাতত কার্যকর থাকছে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। ফলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ নিয়েও নতুন করে রাজনৈতিক জল্পনা তৈরি হয়েছে।
তবে তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, এটি কোনও ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়। বরং নির্বাচনের ফলাফল এবং সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে গোটা সংগঠনকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ। দলের তরফে জানানো হয়েছে, শীঘ্রই কর্মক্ষমতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক ভূমিকার মূল্যায়নের ভিত্তিতে নতুন নেতৃত্ব ও নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন দলীয় শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা, তেমনই অন্যদিকে এটি ভবিষ্যতের নেতৃত্ব নির্ধারণের পথও তৈরি করছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে নতুন কমিটি গঠন এবং বিদ্রোহী শিবিরের ভবিষ্যৎ অবস্থান স্পষ্ট হলে তৃণমূলের আগামী রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা আরও পরিষ্কার হবে। বর্তমানে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তৃণমূলের এই আত্মসমীক্ষা কি দলকে নতুন শক্তি দেবে, নাকি অভ্যন্তরীণ সংকট আরও গভীর করবে? তার উত্তর লুকিয়ে রয়েছে আগামী দিনের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মধ্যেই।




















