আঠারো বছরের আক্ষেপ থেকে টানা দুইবার চ্যাম্পিয়ন, বদলে যাওয়া আরসিবির পাঁচ রহস্য

দীর্ঘ ব্যর্থতার ইতিহাস পেরিয়ে টানা দুইবার আইপিএল জিতে নতুন যুগের সূচনা করেছে আরসিবি। সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে পাঁচটি বড় পরিবর্তন।

By Kolkata24x7 Team

Published:

Follow Us
five-reasons-behind-rcb-back-to-back-ipl-titles

একসময় আইপিএলের সবচেয়ে জনপ্রিয় অথচ সবচেয়ে হতাশাগ্রস্ত দল বলা হত রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুকে। বিরাট কোহলি, ক্রিস গেইল, এবি ডি ভিলিয়ার্সের মতো কিংবদন্তিদের পেয়েও ট্রফির মুখ দেখেনি তারা। ২০০৮ থেকে ২০২৪—আঠারো বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা, অসংখ্য ব্যর্থতা, ট্রোল, হতাশা আর অপূর্ণতার ইতিহাস ছিল আরসিবির পরিচয়। কিন্তু ক্রিকেটে যেমন সব গল্প একরকম হয় না, তেমনই বদলে গেল বেঙ্গালুরুর ভাগ্য। প্রথমবার ট্রফি জয়ের পর থেমে থাকেনি তারা। বরং পরের বছরও চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজেদের নতুন যুগের সূচনা করেছে। কীভাবে সম্ভব হল এই আমূল পরিবর্তন? কেন যে দল একসময় চাপের মুহূর্তে ভেঙে পড়ত, সেই দল এখন ফাইনাল জিতছে নিয়মিত? এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

১. বিরাট কোহলির নতুন ভূমিকা ও নেতৃত্ব

রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর সাফল্যের সবচেয়ে বড় কারণ নিঃসন্দেহে বিরাট কোহলি। তবে এই অবদানের মাপকাঠি শুধু রান নয়। অধিনায়কত্ব ছাড়ার পর কোহলি যেন আরও পরিণত ক্রিকেটারে পরিণত হয়েছেন। একসময় দলের সমস্ত চাপ তাঁর কাঁধে ছিল। রান করতে হবে, দলকে নেতৃত্ব দিতে হবে, মাঠে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সব দায়িত্বই প্রায় একা সামলাতেন। ফলে অনেক সময় তাঁর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের উপরেও প্রভাব পড়ত। কিন্তু এখন তিনি দলের ‘মেন্টর-লিডার’ হিসেবে কাজ করছেন।

   

আরও পড়ুন: সবুজ-মেরুন ছাড়লেন ডেগি কার্ডোজো, ‘বিস্ফোরক’ পোস্টে বিদায়ের কথা

কোহলির সবচেয়ে বড় অবদান হল ড্রেসিংরুমে আত্মবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করা। তরুণ ক্রিকেটাররা তাঁর উপস্থিতি থেকে অনুপ্রেরণা পান। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনি এখনও দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটার। ফাইনালের মতো বড় মঞ্চে তাঁর ৭৫ রানের ইনিংস প্রমাণ করে, বয়স বাড়লেও ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা কমেনি। পাশাপাশি তিনি দলের সংস্কৃতি বদলাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। দীর্ঘদিন ট্রফি না জেতা একটি দলের মধ্যে যে মানসিক অবসাদ তৈরি হয়, তা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কোহলির অভিজ্ঞতা অমূল্য ছিল। তাঁর উপস্থিতি দলের ক্রিকেটারদের বিশ্বাস জুগিয়েছে যে আরসিবিও চ্যাম্পিয়ন হতে পারে। সেই বিশ্বাসই পরবর্তীতে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

২. রজত পাতিদারের শান্ত ও কার্যকর অধিনায়কত্ব

আইপিএলে অধিনায়কত্ব অনেক সময় ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে দেয়। আরসিবির ক্ষেত্রে রজত পাতিদারের নেতৃত্ব ছিল সাফল্যের অন্যতম স্তম্ভ। তিনি হয়তো প্রচারের আলোয় থাকেন না, কিন্তু মাঠে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অসাধারণ। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি ক্রিকেটারদের উপর আস্থা রাখতে জানেন।
পাতিদারের নেতৃত্বে আরসিবি এমন একটি দল হয়ে উঠেছে যেখানে প্রত্যেকে নিজের ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখে। তিনি তরুণ ক্রিকেটারদের স্বাধীনতা দিয়েছেন এবং ব্যর্থতার পরেও তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এর ফলে ক্রিকেটাররা ভয়মুক্ত ক্রিকেট খেলতে পেরেছেন। বোলার পরিবর্তন, ফিল্ড সেটিং এবং ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে কৌশল নির্ধারণ—সব ক্ষেত্রেই পাতিদারের পরিণত ভাবনা নজর কাড়ে।

আরও পড়ুন: মুম্বইয়ে অনিশ্চিত হার্দিকের ভবিষ্যৎ, নতুন গন্তব্য নিয়ে জোর জল্পনা

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তিনি কখনও নিজেকে দলের কেন্দ্রবিন্দু বানানোর চেষ্টা করেন না। বরং দলের প্রতিটি সদস্যকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করান। এই নেতৃত্বের ধরন ড্রেসিংরুমে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছে। অতীতে আরসিবি অনেকবার প্রতিভাবান দল নিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। কারণ তারা একটি সুসংহত ইউনিট হয়ে উঠতে পারেনি। পাতিদারের অধীনে সেই সমস্যা দূর হয়েছে। তিনি তারকাদের নিয়ে নয়, একটি সম্পূর্ণ দল তৈরি করেছেন। আর সেই দলই টানা দুইবার ট্রফি জিতেছে।

৩. শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ বোলিং আক্রমণ

দীর্ঘদিন ধরে আরসিবির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল বোলিং। চিন্নাস্বামীর ছোট মাঠে বড় স্কোর করলেও সেই রান রক্ষা করতে পারত না দল। কিন্তু গত দুই মরশুমে এই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। ভুবনেশ্বর কুমার, জস হ্যাজেলউড এবং রশিখ সালামদের নিয়ে গড়ে ওঠা বোলিং ইউনিট আরসিবিকে নতুন পরিচয় দিয়েছে।

ভুবনেশ্বরের সুইং এবং অভিজ্ঞতা পাওয়ারপ্লেতে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলেছে। হ্যাজেলউড মিডল ওভারে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়েছেন। অন্যদিকে তরুণ রশিখ সালাম গতির হেরফের ও বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়ের মাধ্যমে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন। শুধু উইকেট নেওয়া নয়, রান আটকে রাখার ক্ষেত্রেও এই বোলাররা অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ব্যাটিং যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, ট্রফি জেতার জন্য শক্তিশালী বোলিং আক্রমণ অপরিহার্য। আরসিবি অবশেষে সেই সত্যটা উপলব্ধি করেছে। তাদের বোলাররা শুধু সহায়ক ভূমিকায় থাকেননি, বরং অনেক ম্যাচের নায়ক হয়েছেন। ফাইনালেও গুজরাতকে ১৫৫ রানে আটকে রাখার পিছনে বোলারদের ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই বোলিং শক্তিই আরসিবিকে ‘জনপ্রিয় দল’ থেকে ‘চ্যাম্পিয়ন দল’-এ পরিণত করেছে।

৪. তরুণ ক্রিকেটারদের উত্থান ও সঠিক ব্যবহার

যে কোনও সফল দলের জন্য নতুন প্রতিভার উত্থান অত্যন্ত জরুরি। আরসিবির সাম্প্রতিক সাফল্যের অন্যতম কারণ হল তরুণ ক্রিকেটারদের উপর আস্থা রাখা। অতীতে দলটি অনেক সময় শুধু বড় নামের উপর নির্ভর করত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। তরুণদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশও তৈরি করা হয়েছে।

রশিখ সালামের মতো ক্রিকেটাররা বড় ম্যাচে দায়িত্ব পালন করে নিজেদের প্রমাণ করেছেন। শুধু তাই নয়, ব্যাটিং এবং ফিল্ডিংয়েও তরুণদের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তারা দলের মধ্যে নতুন উদ্যম ও ইতিবাচকতা নিয়ে এসেছে। অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সঙ্গে তরুণদের মেলবন্ধন আরসিবির শক্তি বাড়িয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হল, তরুণদের ভুল করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ঝুঁকি নিতেই হয়। সেই ঝুঁকি নিতে গিয়ে ব্যর্থ হলেও দল তাদের পাশে থেকেছে। ফলে ক্রিকেটাররা আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলতে পেরেছেন। এই নীতি দীর্ঘমেয়াদে দলকে লাভবান করেছে। এখন আরসিবির স্কোয়াডে শুধু তারকা নয়, ভবিষ্যতের তারকারাও রয়েছে। এই ধারাবাহিক প্রতিভা সরবরাহই তাদের সাফল্যকে স্থায়ী করতে সাহায্য করছে।

৫. মানসিকতার পরিবর্তন: ‘চোকার’ থেকে ‘চ্যাম্পিয়ন’

আরসিবির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে মানসিকতায়। বহু বছর ধরে দলটিকে ‘চোকার’ বলা হত। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ভালো খেলেও শেষ মুহূর্তে হেরে যাওয়া ছিল তাদের পরিচিত ছবি। কিন্তু গত দুই মরশুমে সেই মানসিক দুর্বলতা সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

এখন দল চাপকে ভয় পায় না, বরং উপভোগ করে। ফাইনাল, প্লে-অফ কিংবা কঠিন রান তাড়া—যে পরিস্থিতিই হোক, ক্রিকেটারদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট দেখা যায়। তারা জানে কীভাবে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত সামলাতে হয়। এই আত্মবিশ্বাস একদিনে আসেনি। প্রথম ট্রফি জয়ের পর দল বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তারা সত্যিই চ্যাম্পিয়ন হতে পারে। সেই বিশ্বাসই দ্বিতীয় ট্রফির পথে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে ওঠে।

অতীতে আরসিবি অনেক সময় ব্যক্তিগত প্রতিভার উপর নির্ভর করত। এখন তারা দলগত ক্রিকেট খেলছে। একজন ব্যর্থ হলে অন্যজন দায়িত্ব নিচ্ছে। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা বদলানো এবং ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও বেড়েছে। এই মানসিক দৃঢ়তাই তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কারণ ক্রিকেটে দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বড় ট্রফি জিততে গেলে শেষ পর্যন্ত মানসিক শক্তিই পার্থক্য গড়ে দেয়। আর সেই জায়গাতেই আজকের আরসিবি অতীতের আরসিবির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর এই সাফল্য শুধুমাত্র দুটি আইপিএল ট্রফি জয়ের গল্প নয়, এটি একটি মানসিকতার পরিবর্তনের গল্প। আঠারো বছরের হতাশা, ব্যর্থতা এবং সমালোচনাকে পিছনে ফেলে কীভাবে একটি দল নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে, তারই উদাহরণ আরসিবি। বিরাট কোহলির অভিজ্ঞতা, রজত পাতিদারের নেতৃত্ব, শক্তিশালী বোলিং আক্রমণ, তরুণদের উত্থান এবং জয়ী মানসিকতা—এই পাঁচ স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আরসিবি। একসময় যারা ট্রফির জন্য হাহাকার করত, তারাই এখন আইপিএলের নতুন শক্তি। প্রশ্ন আর ট্রফি জিতবে কি না নয়, বরং এই আধিপত্য কতদিন ধরে রাখতে পারবে, সেটাই এখন দেখার।

ভিডিও নিউজ দেখুন

Kolkata24x7 Team

আমাদের প্রতিবেদন গুলি kolkata24x7 Team এর দ্বারা যাচাই করে লেখা হয়। আমরা একটি স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম যা পাঠকদের জন্য স্পষ্ট এবং সঠিক খবর পৌঁছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের লক্ষ্য এবং সাংবাদিকতার মান সম্পর্কে জানতে, অনুগ্রহ করে আমাদের About us এবং Editorial Policy পৃষ্ঠাগুলি পড়ুন।

Follow on Google