প্রশ্নে মমতার ল্যান্ড ব্যাঙ্ক! শিল্পোন্নয়নে কেন্দ্রের থেকে জমি কিনছে রাজ্য

পশ্চিমবঙ্গের শিল্পনীতিতে ফের নতুন করে চর্চায় উঠে এল ‘ল্যান্ড ব্যাঙ্ক’ প্রশ্ন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার শিল্পোন্নয়নের লক্ষ্যে কেন্দ্র সরকারের কাছ থেকে প্রায় এক হাজার একর জমি ...

By Sandipa Sil

Published:

Follow Us
west-bengal-land-bank-issue-state-buying-land-from-centre

পশ্চিমবঙ্গের শিল্পনীতিতে ফের নতুন করে চর্চায় উঠে এল ‘ল্যান্ড ব্যাঙ্ক’ প্রশ্ন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার শিল্পোন্নয়নের লক্ষ্যে কেন্দ্র সরকারের কাছ থেকে প্রায় এক হাজার একর জমি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দুর্গাপুর সংলগ্ন রূপনারায়ণপুরে অবস্থিত বন্ধ হয়ে যাওয়া হিন্দুস্থান কেবলস লিমিটেডের জমিই এই পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দু। রাজ্যের দাবি, শিল্পে গতি আনতে জমির জোগান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, আর সেই কারণেই কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে এই জমি কেনার পথে হাঁটছে নবান্ন।

হিন্দুস্থান কেবলস লিমিটেড একসময় দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এই কারখানা কার্যত বন্ধ। মরচে ধরা গেট, পরিত্যক্ত ভবন ও নীরব কারখানা চত্বর আজ এলাকাটির বাস্তব ছবি। এই প্রায় এক হাজার একর জমি বর্তমানে কেন্দ্র সরকারের মালিকানাধীন। রাজ্য সরকার এই জমি কিনে সেখানে একটি আধুনিক শিল্পপার্ক গড়ে তুলতে চায়, যেখানে একাধিক মাঝারি ও বড় শিল্প সংস্থা বিনিয়োগ করতে পারবে।

   

নবান্ন সূত্রে খবর, ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি সংস্থা এই জমিতে শিল্প স্থাপনের ব্যাপারে রাজ্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রাংশ, কেবল উৎপাদন, লজিস্টিক্স ও সবুজ শক্তি-নির্ভর শিল্পের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুর্গাপুরের রেল ও সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ পরিকাঠামো এবং বিদ্যমান শিল্প পরিবেশ এই প্রকল্পের জন্য অনুকূল বলেই মনে করছেন রাজ্যের শিল্প দফতরের আধিকারিকরা।

এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। অতীতে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই জোর দিয়েছেন – জোর করে জমি অধিগ্রহণ নয়, শিল্পের জন্য প্রয়োজন হলে জমি কিনে নেওয়া হবে। সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগ হিসেবেই কেন্দ্র সরকারের কাছ থেকে জমি কেনার এই উদ্যোগ বলে দাবি তৃণমূল শিবিরের। ২০২৩ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাক্ষাতের একটি ছবি ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে, যা কেন্দ্র-রাজ্য সহযোগিতার প্রতীক হিসেবেই তুলে ধরছে শাসকদল।

তবে এই পরিকল্পনা ঘিরে প্রশ্নও উঠছে। একাংশের মতে, গত প্রায় ১৫ বছরে রাজ্যের শিল্পোন্নয়নের সার্বিক চিত্র খুব একটা উজ্জ্বল নয়। বড় বিনিয়োগ এলেও বহু প্রকল্প মাঝপথে থমকে গিয়েছে বা প্রত্যাশামতো কর্মসংস্থান দিতে পারেনি, এমন অভিযোগ নতুন নয়। দুর্গাপুরেই অতীতে হিন্দুস্থান কেবলস পুনরুজ্জীবনের জন্য নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ, যেমন মেডিক্যাল এইড সেন্টার প্রকল্প, শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি বলে বিরোধীদের দাবি।

শ্রমিক সংগঠনগুলির বিরোধিতাও ইতিমধ্যেই সামনে এসেছে। বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন সিটু (CITU) এই জমি বিক্রির বিরোধিতা করে প্রশ্ন তুলেছে,  রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার জমি কি বেসরকারি শিল্পের জন্য ছেড়ে দেওয়া উচিত? তাঁদের দাবি, কেন্দ্র ও রাজ্য মিলিতভাবে হিন্দুস্থান কেবলসকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা যেত, জমি বিক্রি শেষ রাস্তা হওয়া উচিত নয়।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। একাংশ আশা করছেন, এই শিল্পপার্ক গড়ে উঠলে দুর্গাপুর ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, বন্ধ শিল্পাঞ্চল আবার প্রাণ ফিরে পাবে। আবার অনেকেই সংশয় প্রকাশ করছেন, আদৌ কি এই জমিতে পরিকল্পিত শিল্প বাস্তবায়িত হবে, নাকি এটিও অতীতের মতো প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

সব মিলিয়ে, কেন্দ্রের কাছ থেকে এক হাজার একর জমি কেনার সিদ্ধান্ত রাজ্যের শিল্পনীতিতে একটি বড় পদক্ষেপ হলেও, তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ল্যান্ড ব্যাঙ্ক ও শিল্পোন্নয়ন কৌশলকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আগামী দিনে এই জমিতে বাস্তব বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কতটা হয়, তার উপরই নির্ভর করবে এই সিদ্ধান্তের সাফল্য ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা।

ভিডিও নিউজ দেখুন

Sandipa Sil

আইনের ছাত্রী। শিক্ষানবীশ আইনজীবী। সাংবাদিকের সঙ্গে সংসারের সূত্রে সংবাদে আগ্রহ। কলকাতা24x7-এর মাধ্যমে পথ চলার শুরু।

Follow on Google