হিংসাত্মক পার্টি সিপিএম ইসলাম বিরোধী: শারজিল ইমাম

২০২০ সালের শুরুতেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (Sharjeel Imam) বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছিল দেশের রাজধানী দিল্লি। শাহিনবাগ থেকে জামিয়া, জাফরাবাদ একাধিক এলাকায় মাসের পর মাস ধরে চলেছিল প্রতিবাদ, ...

By Sandipa Sil

Published:

Follow Us
sharjeel-imam-cpm-anti-islam-statement-case

২০২০ সালের শুরুতেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (Sharjeel Imam) বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছিল দেশের রাজধানী দিল্লি। শাহিনবাগ থেকে জামিয়া, জাফরাবাদ একাধিক এলাকায় মাসের পর মাস ধরে চলেছিল প্রতিবাদ, অবস্থান ও বিক্ষোভ।

সেই আন্দোলনের মাঝেই জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি এক সভায় দেওয়া জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) প্রাক্তন ছাত্রনেতা শারজিল ইমামের বক্তব্য ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। ওই ভাষণে ভারত থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করার আহ্বান জানানো হয়েছে এই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়। তারপর থেকে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বিচারাধীন অবস্থায় হাজতবাস চলছে শারজিল ইমামের।

   

তবে ওই বিতর্কিত ভাষণের আরেকটি দিক সে সময় তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হলেও বর্তমানে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সেই ভাষণেই বাংলার টানা ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকার এবং সিপিএমকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন শারজিল ইমাম। বাম রাজনীতির ইতিহাস, রাজনৈতিক হিংসা, সংখ্যালঘু নীতি এবং সংরক্ষণ প্রশ্নে সিপিএমের ভূমিকা নিয়ে তিনি একাধিক বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।

PM Kisan ২২তম কিস্তি নিয়ে বড় আপডেট, জেনে নিন সম্পূর্ণ তথ্য

ছয় বছর আগের সেই ভাষণে শারজিল ইমাম সরাসরি বলেন, “সিপিএম হিংসাত্মক পার্টি। তাদের হিংসাত্মক শাসনের ইতিহাস আছে। যেমন বিজেপি। দুই দলই সমান।” তাঁর বক্তব্যে বিজেপি ও সিপিএম উভয় দলকেই একই সারিতে রেখে রাজনৈতিক হিংসার জন্য দায়ী করা হয়। তিনি দাবি করেন, কেরল এবং পশ্চিমবঙ্গ দুই রাজ্যেই সিপিএমের শাসনামলে হিংসার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। শারজিলের কথায়, “সবসময় মাথায় রাখতে হবে যে সিপিএম হিংসাত্মক পার্টি। তাদের কেরল এবং বাংলার ইতিহাস পড়ে দেখবেন।”

শুধু তাই নয়, শারজিল অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক হিংসায় উসকানি দিয়ে পরে সিপিএম দায় এড়িয়ে গেছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, “তারা এখানে হিংসায় উসকানি দিয়ে গা ঢাকা দিয়েছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে বাম রাজনীতির নৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ আসে যখন শারজিল ইমাম সিপিএমকে ‘ইসলাম বিরোধী’ দল হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর ভাষায়, “ইসলামের মতোই সিপিএমের দুই ভাগ—মানহাজ এবং মাসলাক। কমিউনিস্ট এবং সিপিএমের মধ্যে পার্থক্য আছে। সিপিএম ইসলাম বিরোধী।” এই মন্তব্য ঘিরেই বাম শিবিরে ব্যাপক অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। শারজিলের দাবি ছিল, কেরল ও পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের রাজনীতি নিয়ে মুসলিম সমাজের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের প্রসঙ্গ টেনে শারজিল ইমাম বলেন, বামফ্রন্ট সরকারের আমলে মুসলিমদের জন্য কোনও বাস্তব সংরক্ষণ নীতি কার্যকর হয়নি। তাঁর অভিযোগ, “পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের সংরক্ষণ দেয়নি সিপিএম। গরিব করে রেখেছিল। সব মুসলিম জেনারেল হিসেবে গণ্য হতেন।” অর্থাৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও মুসলিমদের সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।

সংরক্ষণ নীতি প্রসঙ্গে শারজিল আরও বলেন, সিপিএম আদতে সংরক্ষণের বিরোধী ছিল। মণ্ডল কমিশনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “২০০৮ সালে মণ্ডল কমিশন লাগু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলায়। বামেরা মণ্ডল কমিশনেরও বিরোধী ছিল।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু বাম নয়, কংগ্রেসও সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পাশে প্রকৃত অর্থে কখনও দাঁড়ায়নি। শারজিলের মন্তব্য, “বাম হোক বা কংগ্রেস—কেউ কখনোই আপনাদের পাশে থাকেনি।”

তাৎপর্যপূর্ণভাবে, আজ সেই শারজিল ইমাম ও উমর খালিদের পাশে দাঁড়িয়েছে বামেরাই। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে সিপিএম শারজিল ও উমরের গ্রেফতারের বিরোধিতা করছে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের জামিনের আবেদন খারিজ করার পর সিপিএম সাংসদ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান।

তিনি লেখেন, “উমর খালিদ ও শরজিল ইসলামকে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে জামিন না দেওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এতে মনে হচ্ছে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের মূল ধারণাটিই উপেক্ষিত হয়েছে।” তাঁর অভিযোগ, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত রাষ্ট্রযন্ত্র ইচ্ছাকৃতভাবে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করছে, যাতে ভিন্নমতকে দমন করা যায়।

অন্যদিকে, ২০২০ সালের দিল্লি হিংসা মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। বিচারপতি অরবিন্দ কুমার ও বিচারপতি এনভি অঞ্জরিয়ার বেঞ্চ জানায়, এই দুই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ বাকি অভিযুক্তদের তুলনায় অনেক বেশি গুরুতর। তাই অন্যদের জামিন মঞ্জুর হলেও উমর ও শারজিলের ক্ষেত্রে সেই সুবিধা দেওয়া যাচ্ছে না।

আদালত আরও জানায়, শুধুমাত্র বিচার-পূর্ব কারাবাস দীর্ঘায়িত হচ্ছে এই যুক্তি কখনও জামিনের ‘ট্রাম্পকার্ড’ হতে পারে না। জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন এখানে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লি পুলিশের দাবি অনুযায়ী, সিএএ বিরোধী আন্দোলনের আড়ালে পরিকল্পিতভাবে অশান্তি ছড়ানোর ছক কষা হয়েছিল, বিশেষ করে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরের সময় আন্তর্জাতিক নজর কাড়ার উদ্দেশ্যে।

২০২০ সালের দিল্লি হিংসায় ৫৩ জনের মৃত্যু হয়। সেই বছরই শারজিল ইমাম আত্মসমর্পণ করেন এবং পরে সেপ্টেম্বর মাসে গ্রেফতার হন উমর খালিদ। ছয় বছর পরেও শারজিলের সেই বিতর্কিত বক্তব্য, বাম রাজনীতি নিয়ে তাঁর তীব্র সমালোচনা এবং বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান—সব মিলিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে ভারতের প্রতিবাদী রাজনীতি ও তার জটিল দ্বন্দ্ব নিয়ে।

ভিডিও নিউজ দেখুন

Sandipa Sil

আইনের ছাত্রী। শিক্ষানবীশ আইনজীবী। সাংবাদিকের সঙ্গে সংসারের সূত্রে সংবাদে আগ্রহ। কলকাতা24x7-এর মাধ্যমে পথ চলার শুরু।

Follow on Google