বাংলার বাইরে বাঙালি মনীষীর বিরাট মূর্তি গড়ছে বিজেপি সরকার

ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে আবারও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এল মূর্তি রাজনীতি। এবার বিষয় বাংলার এক মহান মনীষী, স্বামী বিবেকানন্দ। মধ্যপ্রদেশের বিজেপি সরকার ইন্দোর শহরের সিরপুর লেক গার্ডেনে ...

By Sandipa Sil

Published:

Follow Us
vivekananda-statue-madhya-pradesh-52ft-bjp-indore-controversy

ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে আবারও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এল মূর্তি রাজনীতি। এবার বিষয় বাংলার এক মহান মনীষী, স্বামী বিবেকানন্দ। মধ্যপ্রদেশের বিজেপি সরকার ইন্দোর শহরের সিরপুর লেক গার্ডেনে স্বামী বিবেকানন্দের ৫২ ফুট উচ্চতার একটি বিশাল মূর্তি (Vivekananda statue ) নির্মাণের ঘোষণা করেছে। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব জানিয়েছেন, এই মূর্তিটি হবে দেশের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দের সর্বোচ্চ মূর্তি, যা কর্নাটকের উদুপিতে থাকা ৩৫ ফুট উচ্চতার মূর্তিকেও ছাপিয়ে যাবে। জানা গিয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে।

বাঙালি মনীষী স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তাধারা, দর্শন ও জাতীয়তাবাদী ভাবনাকে সম্মান জানাতেই এই উদ্যোগ বলে দাবি রাজ্য সরকারের। তাঁদের বক্তব্য, যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করতেই এই স্মারক নির্মাণ। তবে এই ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিশেষ করে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাগরিক সমস্যার মধ্যেই এমন ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণ করা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বহু মানুষ।

   

এই প্রকল্প নিয়ে প্রথম দিকেই সমালোচনার সুর শোনা যায় সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট @gemsofbabus_ থেকে, যারা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও শাসনব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে নিয়মিত সমালোচনা করে থাকে। তাদের পোস্টে দাবি করা হয়েছে, ইন্দোর শহরে এখনও জলসংকট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ দূষণ এবং পরিকাঠামোগত দুর্বলতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই পরিস্থিতিতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে একটি বিশাল মূর্তি নির্মাণ কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায়, অধিকাংশ মন্তব্যই প্রকল্পটির বিরোধিতা করেছে। অনেকেই লিখেছেন, মূর্তির বদলে সেই অর্থ স্কুল, হাসপাতাল, পার্ক, পানীয় জল প্রকল্প বা দরিদ্র মানুষের জন্য সামাজিক পরিষেবায় খরচ করা হলে সাধারণ মানুষের উপকার হতো। কেউ কেউ আবার একে “প্রতীকী রাজনীতি” বলে কটাক্ষ করেছেন। তাঁদের মতে, মনীষীদের আদর্শ অনুসরণ না করে শুধুমাত্র তাঁদের মূর্তি বানিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার প্রবণতা বাড়ছে।

উল্লেখযোগ্যভাবে, স্বামী বিবেকানন্দ বাঙালি হলেও তাঁর দর্শন সর্বভারতীয় ও বিশ্বজনীন। তাঁর শিক্ষা, মানবতাবাদ, যুবসমাজের আত্মবিশ্বাস এবং আধ্যাত্মিক শক্তির কথা আজও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু সমালোচকদের একাংশের প্রশ্ন, সেই আদর্শকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা কোথায়? শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোই কি তাঁর ভাবনাকে সম্মান জানানোর প্রকৃত পথ নয়?

বিরোধীরা আরও বলছেন, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বিশাল মূর্তি নির্মাণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। কখনও নেতা, কখনও সাধু-সন্ন্যাসী বা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব—মূর্তি নির্মাণের মাধ্যমে আবেগকে কাজে লাগানোর অভিযোগ উঠছে। এই প্রবণতা একদিকে যেমন জাতীয়তাবাদী বা সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করে, অন্যদিকে তেমনই প্রকৃত উন্নয়নের প্রশ্নকে আড়াল করে দেয় বলেও মত অনেকের।

অন্যদিকে বিজেপি সমর্থকদের বক্তব্য, এই ধরনের স্মারক পর্যটন বাড়ায় এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আনে। তাঁদের দাবি, স্বামী বিবেকানন্দের মতো মহান ব্যক্তিত্বের মূর্তি থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হবে এবং ভারতীয় সংস্কৃতির গৌরব ছড়িয়ে পড়বে।

তবে বাংলার বাইরে একজন বাঙালি মনীষীর এত বড় মাপের মূর্তি নির্মাণ রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সাংস্কৃতিক রাজনীতির অংশ হিসেবেও এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বিবেকানন্দকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের আদর্শিক উত্তরাধিকার দাবি করে আসছে।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রদেশে স্বামী বিবেকানন্দের ৫২ ফুট মূর্তি নির্মাণ শুধু একটি স্থাপত্য প্রকল্প নয়, বরং তা প্রশাসনিক অগ্রাধিকার, উন্নয়নের সংজ্ঞা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিল। প্রশ্ন উঠছে—মনীষীর স্মরণ কি পাথরের মূর্তিতে, নাকি তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত? এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনে এই ধরনের উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করবে।

ভিডিও নিউজ দেখুন

Sandipa Sil

আইনের ছাত্রী। শিক্ষানবীশ আইনজীবী। সাংবাদিকের সঙ্গে সংসারের সূত্রে সংবাদে আগ্রহ। কলকাতা24x7-এর মাধ্যমে পথ চলার শুরু।

Follow on Google