কলকাতা: একেই বলে ভাগ্যচক্র। একসময় যিনি লোকের বাড়ির ঠিকে ঝি ছিলেন আজ তিনি রাজ্যের মন্ত্রী সভায় (Kalita Maji)। রাজ্যে পরিবর্তনের ঝড়ে বদলে যাচ্ছে খোলনলচে। এই পরিবর্তনের ঝড়ে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছে কলিতা মাঝির জীবন। পূর্ব বর্ধমান জেলার গুসকরার বাসিন্দা ৩৭ বছর বয়সী কলিতা মাজির জীবন কখনও সহজ ছিল না। অভাব-অনটনের সংসারে ছোটবেলা থেকেই তাঁকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে।
পরিবারের আর্থিক হাল ফেরাতে তিনি দীর্ঘদিন বিভিন্ন বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করেছেন। জানা যায়, দুটি বাড়িতে কাজ করে মাসে মাত্র আড়াই হাজার থেকে চার হাজার টাকার মতো আয় হতো তাঁর। সেই সামান্য উপার্জন দিয়েই সংসারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করতেন তিনি।
আরও দেখুনঃ সরকারি বাসে চেপে দীঘা-দার্জিলিং সফরও নিখরচায়! দূরপাল্লার ফ্রি টিকিট কীভাবে পাবেন মহিলারা?
তবে কঠিন পরিস্থিতির কাছে হার মানেননি কলিতা। সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনযন্ত্রণা তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে ধীরে ধীরে জনজীবনের সঙ্গে আরও বেশি করে যুক্ত করে। এলাকার সাধারণ মানুষের সমস্যা, বিশেষ করে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মানুষের দাবি-দাওয়া নিয়ে সক্রিয় হতে শুরু করেন তিনি। সেখান থেকেই রাজনীতিতে তাঁর পথচলার সূচনা।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তাঁকে আউশগ্রাম তপশিলি জাতি সংরক্ষিত কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা একজন নারীকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত ছিল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনী প্রচারে কলিতা বারবার নিজের সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন এবং মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, আউশগ্রামের মানুষ তাঁর উপর আস্থা রেখেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী শ্যামাপ্রসন্ন লোহারকে ১২ হাজার ৫৩৫ ভোটে পরাজিত করে প্রথমবারের জন্য বিধায়ক নির্বাচিত হন তিনি। এই জয় শুধু একটি রাজনৈতিক সাফল্য ছিল না, বরং সমাজের নিচুতলা থেকে উঠে আসা একজন নারীর সংগ্রামের স্বীকৃতিও ছিল।
এরপর ১ জুন, ২০২৬-এ রাজ্যের নতুন সরকারের প্রথম বড় মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণে আরও এক নতুন অধ্যায় যোগ হয় তাঁর জীবনে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন কলিতা মাজি। এদিন মোট ৩৫ জন নতুন মন্ত্রী শপথ গ্রহণ করেন, আর তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলির একটি ছিল কলিতা।
শপথ গ্রহণের পর থেকেই রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর উত্থান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই এটিকে সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। কারণ, যে নারী একসময় অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতেন, তিনিই আজ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে চলেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কলিতা মাজির গল্প শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়, বরং সামাজিক গতিশীলতারও এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর এই যাত্রা দেখিয়ে দেয় যে গণতন্ত্রে সাধারণ মানুষের জন্যও সুযোগের দরজা খোলা থাকে। কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং মানুষের সমর্থন থাকলে জীবনের গতিপথ বদলে যেতে পারে। গুসকরার ছোট্ট গলি থেকে রাজ্যের মন্ত্রিসভা পর্যন্ত কলিতা মাজির এই দীর্ঘ পথচলা নিঃসন্দেহে বহু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর নতুন দায়িত্ব পালনের দিকে এখন নজর থাকবে রাজ্যের মানুষের।




















