আবুতে সরব, দীপুতে নীরব- বামেদের প্রতিবাদ কি ভোট নির্ভর?

জ্যান্ত লোকটাকে মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া হয়। গাছের সঙ্গে বেঁধে পেটানো হয়। তারপর আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। উন্মত্ত মৌলবাদীদের এই তাণ্ডব দেখেছে ময়মনসিংহ (Bangladesh)। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে শাস্তি ...

By Sandipa Sil

Published:

Follow Us
left-silence-over-dipu-chandra-das-bangladesh-communal-violence-debate

জ্যান্ত লোকটাকে মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া হয়। গাছের সঙ্গে বেঁধে পেটানো হয়। তারপর আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। উন্মত্ত মৌলবাদীদের এই তাণ্ডব দেখেছে ময়মনসিংহ (Bangladesh)। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন দীপু চন্দ্র দাস। অথচ সেই অবমাননার কোনও প্রমাণ নেই। শুধুমাত্র গুজবের জেরেই এই তাণ্ডব ও খুন।

ময়মনসিংহের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত তেমন কোনও জোরালো প্রতিবাদ চোখে পড়েনি। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ বামেদের কাঁথায় আগুন লেগেছে কি না, তা জানা নেই। তবে তাঁদের মুখে আপাতত কুলুপ। সবদিক বজায় রেখে, অত্যন্ত সাবধানে একটি পোস্ট করেছেন সিপিএমের সাংসদ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তিনি লিখেছেন,
“বাংলাদেশের ভয়াবহ ঘটনা জানান দিচ্ছে ধর্মীয় মৌলবাদের বীভৎসতা। ওখানে মুসলিম মৌলবাদ তোল্লা দিচ্ছে এখানকার হিন্দু মৌলবাদকে। মৌলবাদীরা বিশ্বজুড়ে মাথা চাড়া দিচ্ছে। এখন দুনিয়ার মজদুর এক হবার আওয়াজ দ্রুত ছড়িয়ে দিতে হবে। বলতে হবে—‘সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই’।”

   

এই মানুষটি কোন পক্ষ বা গোষ্ঠীর, সেটাই যেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার উপরই নির্ভর করে বামেদের প্রতিবাদের ঝাঁঝ। বছর দেড়েক আগে বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের কথা মনে আছে? শেখ হাসিনাকে সরানোর সেই আন্দোলনের পটভূমিতে পদ্মাপাড়ে উত্তাল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বহু মানুষের প্রাণ গিয়েছিল। তেমনই একজন শহিদের নাম আবু সাঈদ। পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। বুলেটবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান ভারতবিদ্বেষী আবু সাঈদ।

তাঁর হয়ে কিন্তু আসরে নেমেছিলেন ভারতের বামপন্থী ধর্মনিরপেক্ষ কমরেডরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় লম্বা-লম্বা পোস্ট, রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা প্রতিবাদী সত্তা। অথচ সেই ঘটনার মাত্র এক মাস পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর নির্মম অত্যাচার শুরু হলে, বামেদের মুখে শোনা যায়নি কোনও প্রতিবাদ। উলটে ‘ব্যালান্স’ করার চেষ্টা করেছেন অনেকে। কেউ কেউ আবার পুরনো প্রতিবাদী পোস্ট মুছেও ফেলেছেন।

আবু সাঈদের পক্ষে যাঁরা সরব হয়েছিলেন, ময়মনসিংহের ঘটনায় তাঁরাই নীরব। এরাই আবার দাদরির আখলাককে নিয়ে বড়-বড় কথা বলেন। দীপু চন্দ্র দাসের ক্ষেত্রে সেই প্রতিবাদ যেন জ্বালানি পায় না। এর পিছনেও কি তোষণের রাজনীতি? ভোটের অঙ্ক? তা না হলে এই বাছাই করা প্রতিবাদ কেন?

মুর্শিদাবাদের হরগোবিন্দ দাস ও চন্দন দাস খুনের মামলায় দোষীদের হয়ে আদালতে সওয়াল করেছেন এক সিপিএম নেতা—যিনি আবার সিপিএমের টিকিটে ভোটেও লড়েছেন। বাম জমানায় সিপিএমের স্থানীয় নেতারা পারিবারিক বিবাদও মেটাতেন। নন্দীগ্রামের ঘটনায়ও ভোটের অঙ্ক তাঁদের মাথায় ছিল। কোন পক্ষে থাকলে ভোট বেশি আসবে—সেই হিসেবেই অনেক সময় ‘বিচার’ হতো। প্রতিবাদের ক্ষেত্রেও সেই অঙ্ক যে বাধ্যতামূলক, তা এখন আর অজানা নয়।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ড মনে আছে? সেই গণধর্ষণের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিল তৃণমূল। নেতৃত্বে ছিলেন এক সাংসদ। অথচ সেই একই বছর ফেব্রুয়ারিতে কলকাতায় হওয়া ধর্ষণের ঘটনার সময় তিনি চুপ ছিলেন। তখন তাঁর যুক্তি ছিল—“দিল্লি আর কলকাতার ধর্ষণের পরিপ্রেক্ষিত আলাদা।”

এই তত্ত্বই যেন আজ অনুসরণ করছেন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ বামপন্থীরা। ঘটনার ‘পরিপ্রেক্ষিত’ বুঝে তাঁরা প্রতিবাদ করেন, কিংবা প্রতিবাদের ঝাঁঝ বাড়ান বা কমান। প্রতিবাদের গর্জন নির্ভর করে ভোটের অঙ্কের উপর।

ভারতে ভোটের অঙ্ক বলতে প্রথমেই মাথায় আসে সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক। একটি পুরো গোষ্ঠী যেন কেবল ভোটের সংখ্যায় পরিণত হয়েছে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাতেও কলকাতার রাস্তায় প্রতিবাদ দেখা যায়। উত্তরপ্রদেশ বা গেরুয়া রাজ্যে সংখ্যালঘু নির্যাতনে সরব হন বামেরা। কিন্তু বাংলাদেশে বা মুর্শিদাবাদের সংখ্যালঘুদের রক্তের কোনও দাম নেই তথাকথিত প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ কমরেডদের কাছে।

Sandipa Sil

আইনের ছাত্রী। শিক্ষানবীশ আইনজীবী। সাংবাদিকের সঙ্গে সংসারের সূত্রে সংবাদে আগ্রহ। কলকাতা24x7-এর মাধ্যমে পথ চলার শুরু।

Follow on Google