প্রখ্যাত কুস্তিগীর থেকে কংগ্রেসের বিধায়ক হওয়া ভিনেশ ফোগাটের (Vinesh Phogat) জন্য হরিয়ানা সরকার একটি বিশেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজ্যের ক্রীড়া নীতির আওতায় তাঁকে তিনটি সুবিধার বিকল্প দেওয়া হয়েছে—৪ কোটি টাকার নগদ পুরস্কার, হরিয়ানা শহরী উন্নয়ন প্রাধিকরণের (HSVP) অধীনে একটি প্লট বা ‘গ্রুপ এ’ ক্যাটাগরির একটি সরকারি চাকরি। এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী নায়াব সিং সাইনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রাজ্য মন্ত্রিসভার একটি বৈঠকে। এই তিনটি সুবিধা অলিম্পিকে রৌপ্যপদক বিজয়ীদের জন্য নির্ধারিত সুবিধার সমতুল্য। তবে, ভিনেশ ফোগাট বর্তমানে জিন্দ জেলার জুলানা থেকে বিধায়ক হওয়ায় তিনি এই তিনটির মধ্যে যেকোনো একটি সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। এখনও পর্যন্ত তিনি এই প্রস্তাবের জবাব দেননি।
মুখ্যমন্ত্রী সাইনি বলেন, “ভিনেশ ফোগাট এখন বিধায়ক। তাই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তিনি কোন সুবিধাটি গ্রহণ করতে চান।” তিনি আরও জানান, “ভিনেশ ফোগাট বিধানসভায় এই বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন। আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকে তাঁর কেসটিকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং ক্রীড়া নীতির আওতায় সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
প্যারিস অলিম্পিকে বিতর্ক ও সম্মানের প্রতিশ্রুতি
ভিনেশ ফোগাট প্যারিস অলিম্পিকে ৫০ কেজি বিভাগে স্বর্ণপদকের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু ফাইনালের আগে ওজন বেশি হওয়ার কারণে তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। এই ঘটনা তাঁর ক্যারিয়ারে একটি বড় ধাক্কা হলেও, হরিয়ানার মানুষ তাঁকে সমর্থন জানিয়েছে। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী সাইনি টুইট করে বলেছিলেন, “ভিনেশ ফোগাট হরিয়ানার গর্ব। তাঁর সম্মান কমতে দেওয়া হবে না।” তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, বিনেশকে অলিম্পিক রৌপ্যপদক বিজয়ীর সম্মান দেওয়া হবে।
চলমান বাজেট অধিবেশনে বিনেশ বিধানসভায় এই প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, বিনেশ আমাদের মেয়ে। তাঁকে রৌপ্যপদক বিজয়ীর সম্মান দেওয়া হবে। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি এখনও পূরণ হয়নি।” তিনি আরও যোগ করেন, “এটি টাকার বিষয় নয়, এটি সম্মানের বিষয়। রাজ্যের অনেক মানুষ আমাকে বলেন, আমি নিশ্চয়ই নগদ পুরস্কার পেয়েছি।”
কুস্তি থেকে রাজনীতি: বিনেশের যাত্রা
ভিনেশ ফোগাট একজন কুস্তিগীর হিসেবে ভারতের জন্য অনেক সম্মান এনেছেন। তিনি কমনওয়েলথ গেমসে স্বর্ণপদক জিতেছেন এবং অলিম্পিকে তাঁর পারফরম্যান্স দিয়ে দেশের গর্ব বাড়িয়েছেন। ২০২৪ সালে প্যারিস অলিম্পিকে তাঁর অযোগ্যতার পর তিনি কুস্তি থেকে অবসর নেন এবং রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচনে তিনি কংগ্রেসের টিকিটে জুলানা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং ৬,০১৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। এই জয় তাঁকে রাজ্যের প্রথম মহিলা কুস্তিগীর বিধায়ক হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।
বিনেশের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালে, যখন তিনি প্রাক্তন রেসলিং ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলন তাঁকে জনগণের কাছে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে এবং তাঁর রাজনৈতিক পথ প্রশস্ত করে।
কোন সুবিধা বেছে নেবেন বিনেশ?
হরিয়ানা সরকারের এই প্রস্তাব বিনেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুহূর্ত। ৪ কোটি টাকার নগদ পুরস্কার তাঁর আর্থিক সুরক্ষা দিতে পারে। একটি প্লট তাঁর ভবিষ্যতের জন্য একটি সম্পদ হতে পারে। আর ‘গ্রুপ এ’ চাকরি তাঁকে সরকারি ক্ষেত্রে একটি সম্মানজনক পদ দিতে পারে। তবে, বিধায়ক হিসেবে তিনি ইতিমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। তাই তিনি কোন পথ বেছে নেবেন, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিনেশ সম্মানের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেন। তাই তিনি হয়তো এমন একটি বিকল্প বেছে নেবেন, যা তাঁর ক্রীড়াবিদ হিসেবে অবদানকে স্বীকৃতি দেয় এবং তাঁর নির্বাচনী এলাকার মানুষের জন্যও উপকারী হয়।
মুখ্যমন্ত্রীর অন্যান্য ঘোষণা
মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সাইনি জানান, পাঞ্জাবের একদল কৃষক, যাদের মধ্যে ১৫-২০ জন সরপঞ্চ ছিলেন, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, পাঞ্জাবের মানুষ কংগ্রেস এবং আম আদমি পার্টির (AAP) প্রতি হতাশ এবং এখন বিজেপির দিকে ঝুঁকছেন। তিনি বলেন, “পাঞ্জাবের কৃষকরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে তাদের আদর্শ মানেন। তাঁর নীতি দেশের মানুষকে মুগ্ধ করেছে। গত ১০ বছরে মোদী ভারতের বিশ্বমঞ্চে মর্যাদা বাড়িয়েছেন।”
আসন্ন গম ক্রয় মরসুম নিয়ে সাইনি বলেন, তিনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন। রাজ্যে ৭৫ লক্ষ মেট্রিক টন গম আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি জানান, “কৃষকদের ফসল তোলা, বস্তা বা মণ্ডি-সংক্রান্ত কোনো সমস্যায় পড়তে দেওয়া হবে না।”
বিনেশের প্রভাব ও প্রত্যাশা
ভিনেশ ফোগাট শুধু একজন ক্রীড়াবিদ বা বিধায়ক নন, তিনি হরিয়ানার নারীদের জন্য একটি প্রেরণা। তাঁর অলিম্পিকে অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক সাফল্য তরুণ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়। তিনি যে সুবিধা বেছে নেবেন, তা তাঁর ক্রীড়া জীবনের সম্মান এবং রাজনৈতিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার একটি প্রতীক হবে।
হরিয়ানা সরকারের এই উদ্যোগ ভিনেশ ফোগাটের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ও সমর্থনের প্রমাণ। তিনি কোন পথ বেছে নেবেন, তা দেখার জন্য হরিয়ানার মানুষ মুখিয়ে আছেন। এটি শুধু একটি পুরস্কার নয়, বরং তাঁর সংগ্রাম, সাহস এবং অবদানের স্বীকৃতি। বিনেশের এই নতুন অধ্যায় তাঁকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে, এটাই প্রত্যাশা।