
ওয়াশিংটন: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন শুল্কনীতিতে ফের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখে ভারত। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া যে কোনও দেশের ওপর ২৫ শতাংশ ‘তাৎক্ষণিক’ শুল্ক চাপানোর ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প, যার সরাসরি অভিঘাত পড়তে পারে নয়াদিল্লির ওপর। বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন ভারত–মার্কিন সম্পর্ক সাম্প্রতিক অতীতে সবচেয়ে জটিল অধ্যায় অতিক্রম করছে।
সোমবার নিজের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানান, ইরানের সঙ্গে যেসব দেশ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, তাদের সঙ্গে আমেরিকার সমস্ত লেনদেনে এই শুল্ক কার্যকর হবে। সিদ্ধান্তকে তিনি “চূড়ান্ত ও আপসহীন” বলে বর্ণনা করেন এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার প্রেক্ষিতে এটিকে চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে তুলে ধরেন।
ভারতের জন্য বাড়তি দুশ্চিন্তা
এই ঘোষণায় উদ্বেগ বেড়েছে ভারতের নীতিনির্ধারক মহলে। ইরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, বিশেষ করে জ্বালানি আমদানি এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চাবাহার বন্দর প্রকল্প। পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযোগের জন্য চাবাহার ভারতের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ ‘স্ট্র্যাটেজিক গেটওয়ে’।
ভারতীয় রপ্তানিতে ‘শুল্ক-ধাক্কা’ Trump Iran Tariffs India Impact
ইরান-সংক্রান্ত এই শুল্ক যুক্ত হওয়ায় ভারতের ওপর চাপ আরও বাড়ল। ইতিমধ্যেই ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক এবং রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার কারণে আরও ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে আমেরিকা। এর সঙ্গে ইরান-সংক্রান্ত শুল্ক যোগ হলে, ভারতীয় রপ্তানির ওপর কার্যত মোট শুল্ক ৭৫ শতাংশে পৌঁছতে পারে, যা বহু শিল্পক্ষেত্রের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাকেও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে দুই দেশ সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা চালালেও, সরকারি মহলের একাংশ একে প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পর্যায় বলে মনে করছে।
ভারত–ইরান বাণিজ্যের বাস্তব চিত্র
চিন ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারতও তেহরানের শীর্ষ পাঁচ বাণিজ্যিক সঙ্গীর মধ্যে রয়েছে। তেহরানে ভারতীয় দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৬৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ভারতের রপ্তানি ১.২৪ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি প্রায় ৪৪০ মিলিয়ন ডলার।
ইরানে ভারতের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে, অর্গানিক কেমিক্যাল, বাসমতি চাল, চা, চিনি, ওষুধ, ফল, ডাল ও মাংসজাত পণ্য। অপরদিকে ইরান থেকে ভারত আমদানি করে মিথানল, পেট্রোলিয়াম বিটুমেন, তরল প্রোপেন, আপেল, খেজুর ও বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনের কারণে এই বাণিজ্য বারবার ওঠানামা করেছে। ২০২০–২১ সালে বড় ধসের পর ২০২২–২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২.৩৩ বিলিয়ন ডলারে, যদিও ২০২৩ সালে ফের নিম্নমুখী হয়।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মার্কিন শুল্ক কঠোরভাবে কার্যকর হলে বহু ভারতীয় সংস্থা ইরানের সঙ্গে লেনদেন কমাতে বাধ্য হতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে রাসায়নিক, কৃষি ও ওষুধ শিল্পে।
বাণিজ্যের বাইরেও কৌশলগত চাপ
এই সিদ্ধান্ত শুধু বাণিজ্যিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও ভারতের জন্য অস্বস্তিকর। চাবাহার বন্দর প্রকল্প ভারতের আঞ্চলিক যোগাযোগ, মানবিক সহায়তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে এই প্রকল্পের জন্য আমেরিকা সীমিত ছাড় দিলেও, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর সেই ছাড় ভবিষ্যতে থাকবে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জ্বালানি নিরাপত্তাও আরেকটি বড় ইস্যু। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ইরান থেকে তেল আমদানি কমিয়েছে, তবু দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে তেহরান ভারতের জ্বালানি বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কূটনৈতিক ভারসাম্যের কঠিন পরীক্ষা
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসনের তরফে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের বার্তাও দেওয়া হচ্ছে। সোমবার নয়াদিল্লিতে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর বলেন, “ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার আর কেউ নেই।” তিনি জানান, মতপার্থক্য সত্ত্বেও বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।
গোর আরও বলেন, “প্রকৃত বন্ধুদের মধ্যে মতভেদ থাকতেই পারে” এবং ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন।
তবে বাস্তবতা হল, ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি ভারতের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন তুলে দিল, কৌশলগত স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের মধ্যে কোন পথে হাঁটবে নয়াদিল্লি? এই সিদ্ধান্তের উত্তরই আগামী দিনে ভারত–মার্কিন সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
World: US President Donald Trump imposes a fresh 25% tariff on countries trading with Iran. India faces a total 75% tariff burden on US exports, threatening the Chabahar Port and energy security. Read how this impacts New Delhi-Washington diplomatic ties.









