মৃত্যুদণ্ডে রেকর্ড ভাঙল মক্কা–মদিনার দেশ

saudi-arabia-death-penalty-record-2025

নিজেদেরই আগের রেকর্ড ভেঙে ফেলল সৌদি আরব (Saudi Arabia Death Penalty Record 2025)। এক বছরে সর্বাধিক সংখ্যক অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে বিশ্বজুড়ে ফের তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এল মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সৌদি আরবে মোট ৩৪০ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। এই সংখ্যার নিরিখে সৌদি আরব এখন বিশ্বে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশগুলির তালিকায় তৃতীয় স্থানে চিন ও ইরানের পরেই।

সৌদি কর্তৃপক্ষ ১৫ ডিসেম্বর আরও তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতেই সামনে আসে এই চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান। উল্লেখযোগ্যভাবে, এটি সৌদি আরবের টানা দ্বিতীয় বছর নিজস্ব রেকর্ড ভাঙার ঘটনা। ২০২৪ সালে যেখানে ৩৩৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে সেই সংখ্যাও ছাপিয়ে গিয়েছে।

   

নিলামে অবিক্রিত এই বাংলার ক্রিকেটারকে দলে টেনে চমকে দিল নাইট শিবির

বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যায় এই বিপুল বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ সৌদি আরবের চলমান ‘মাদক বিরোধী যুদ্ধ’ (War on Drugs)। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া এই অভিযানের আওতায় মাদক সংক্রান্ত অপরাধে শাস্তির মাত্রা আরও কঠোর করা হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে কার্যকর হওয়া ৩৪০টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ২৩০টিরও বেশি ছিল মাদক সংক্রান্ত মামলায়। মাদক পাচার, সংরক্ষণ কিংবা বড়সড় মাদক চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগেই অধিকাংশ অভিযুক্তের ফাঁসি হয়েছে।

সৌদি সরকারের যুক্তি অবশ্য ভিন্ন। তাদের দাবি, দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই মৃত্যুদণ্ড প্রয়োজনীয়। সৌদি প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া এবং আপিলের সুযোগ শেষ হওয়ার পরই চূড়ান্তভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। কোনও ক্ষেত্রেই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না বলেই দাবি কর্তৃপক্ষের।

তবে এই যুক্তি মানতে নারাজ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-সহ একাধিক মানবাধিকার গোষ্ঠী সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের এমন ব্যাপক ব্যবহারের তীব্র নিন্দা করেছে। তাদের অভিযোগ, এটি শুধুমাত্র শাস্তি নয়, অনেক ক্ষেত্রেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। বিশেষ করে মাদক সংক্রান্ত অপরাধে এত বিপুল সংখ্যক ফাঁসি কার্যকর হওয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী বলে মত তাদের।

মানবাধিকার সংগঠনগুলির আরও দাবি, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উচ্চাকাঙ্ক্ষী সংস্কার পরিকল্পনা ‘ভিশন ২০৩০’-এর সঙ্গে এই মৃত্যুদণ্ড নীতির স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। ভিশন ২০৩০-এর মাধ্যমে সৌদি আরবকে আধুনিক, উদার এবং বিশ্বমুখী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন যুবরাজ।

নারী স্বাধীনতা, বিনোদন শিল্পের প্রসার, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এই সব সংস্কারের মাঝেও ফাঁসির মতো কঠোর শাস্তির বহুল প্রয়োগ আন্তর্জাতিক মহলে সৌদির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব একদিকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থায় কঠোরতা দেখাতে চাইছে, অন্যদিকে বিশ্ব দরবারে নিজেকে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এই দুই নীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতেই গিয়ে সৌদি প্রশাসন ক্রমশ কঠিন সমালোচনার মুখে পড়ছে।

সব মিলিয়ে, ২০২৫ সালে ৩৪০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া শুধু একটি পরিসংখ্যান নয় এটি সৌদি আরবের শাসননীতি, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। আগামী দিনে এই নীতি বদলায় কি না, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা বিশ্ব।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন