শিকড়ের টানে সংস্কৃত পড়ানো শুরু করছে পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়

sanskrit-course-pakistan-university-lums

বিভাজনের পর এই প্রথমবার—পাকিস্তানের শ্রেণিকক্ষে ফিরে এল সংস্কৃত (Sanskrit course in Pakistan university)। ইতিহাসের দীর্ঘ বিরতির পর পাকিস্তানের এক নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হলো সংস্কৃত ভাষার পূর্ণাঙ্গ কোর্স। লাহোরের Lahore University of Management Sciences (LUMS) সম্প্রতি চার ক্রেডিটের একটি সংস্কৃত কোর্স চালু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিন মাসের একটি উইকএন্ড ওয়ার্কশপে ছাত্রছাত্রী ও গবেষকদের উৎসাহজনক সাড়া পাওয়ার পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এই কোর্সের অন্যতম আকর্ষণ—শুধু ব্যাকরণ বা পাঠ্যাভ্যাসে সীমাবদ্ধ না থেকে, শিক্ষার্থীদের ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বোঝার সুযোগ দেওয়া। সেই লক্ষ্যেই পাঠ্যক্রমে যুক্ত হয়েছে মহাকাব্যিক ধারার পাঠ ও আলোচনা। এমনকি শিক্ষার্থীরা উর্দু অনুবাদে টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিকের থিম সং Hai katha sangram ki-এর সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, যা সংস্কৃত সাহিত্যকে সমকালীন স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করছে।

   

লুমসের গুরমানি সেন্টারের ডিরেক্টর ড. আলি উসমান কাসমি সংবাদমাধ্যমকে জানান, পাকিস্তানে সংস্কৃত গবেষণার সম্ভাবনা বিপুল হলেও তা দীর্ঘদিন অবহেলিত। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে থাকা সংস্কৃত তালপাতার পাণ্ডুলিপির সংগ্রহকে তিনি “সমৃদ্ধ কিন্তু উপেক্ষিত” বলে উল্লেখ করেন।

তাঁর কথায়, ১৯৩০-এর দশকে গবেষক জে.সি.আর. উলনার এই সংগ্রহের ক্যাটালগ তৈরি করেছিলেন, কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর থেকে কোনও পাকিস্তানি গবেষক সেভাবে এতে কাজ করেননি। ফলে বিদেশি গবেষকরাই মূলত এই ভাণ্ডার ব্যবহার করছেন। স্থানীয় গবেষকদের প্রশিক্ষণ শুরু হলে এই চিত্র বদলাবে বলে তাঁর আশা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা এখানেই থামছে না। ভবিষ্যতে Mahabharata ও Bhagavad Gita-কে কেন্দ্র করে আলাদা কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ড. কাসমির মতে, আগামী ১০–১৫ বছরের মধ্যে গীতা ও মহাভারতের পাকিস্তানভিত্তিক গবেষক দেখা গেলে তা মোটেই বিস্ময়কর হবে না।

এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছেন ফর্মান ক্রিশ্চিয়ান কলেজের সমাজবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক ড. শাহিদ রশিদ। তিনি বলেন, “শাস্ত্রীয় ভাষার মধ্যে মানবজাতির জন্য বিপুল জ্ঞান সঞ্চিত। আমি আরবি ও ফারসি শেখার পর সংস্কৃত অধ্যয়ন শুরু করি।” অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পড়াশোনা করে এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষকদের কাছে শিখে প্রায় এক বছরে ধ্রুপদি সংস্কৃত ব্যাকরণ শেষ করেছেন তিনি—তবে শেখা এখনও চলছে।

ড. রশিদের কথায়, অনেকেই তাঁর সংস্কৃত শেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি জবাব দেন, “এটা তো আমাদের অঞ্চলের বন্ধন-ভাষা। সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ Panini এই অঞ্চলেরই মানুষ ছিলেন। সিন্ধু সভ্যতার সময় এখানে বহু রচনা হয়েছে। সংস্কৃত একটি সাংস্কৃতিক স্মারক—পর্বতের মতো। এটাকে আপন করে নেওয়াই উচিত, কারণ এটি কোনও একক ধর্মের সম্পত্তি নয়।”

দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ড. রশিদ মনে করেন, পারস্পরিক শাস্ত্রীয় ঐতিহ্য শেখার মধ্য দিয়েই অঞ্চলটি আরও সংহত হতে পারে। তাঁর ভাষায়, “ভারতে যদি আরও বেশি হিন্দু ও শিখ আরবি শেখেন, আর পাকিস্তানে মুসলিমরা যদি সংস্কৃত পড়েন—তবে ভাষা দেয়াল নয়, সেতু হয়ে উঠবে। এটাই হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য নতুন, আশার শুরু।”

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন