
পাকিস্তান মানেই ‘বিভাজন’ শব্দটির সঙ্গে জুড়ে যায় ১৯৭১-এর স্মৃতি—যে বছরে দেশটি ভেঙে পৃথক হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান, জন্ম নেয় বাংলাদেশ। পাঁচ দশক পরে আজ যে বিভাজনের কথা উঠছে, তা রাজনৈতিক মানচিত্রের। বর্তমান পাক সরকার ফের ছোট ছোট প্রদেশ তৈরির পক্ষে জোর দিচ্ছে। আর সেই প্রস্তাব ঘিরেই উত্তাল হয়ে উঠেছে ইসলামাবাদ থেকে করাচি।
রবিবার পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় যোগাযোগ মন্ত্রী আব্দুল আলীম খান ঘোষণা করেন,“ছোট প্রদেশ অবশ্যই তৈরি হবে।” তাঁর দাবি, প্রদেশ ভাঙলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ যেমন বাড়বে, তেমনই সেবা পৌঁছবে আরও দ্রুত। এই মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়েছে জিও টিভি।
বালোচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় উত্তেজনার মধ্যেই নতুন প্রদেশের ভাবনা
ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির–প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের ‘হাইব্রিড শাসনব্যবস্থা’ যখন বালোচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় স্বাধীনতাকামী জ্বালামুখ মোকাবিলা করছে, ঠিক সেই সময়েই নতুন প্রদেশ তৈরির তৎপরতা রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। ডনের প্রতিবেদন বলছে, গত কয়েক সপ্তাহে সেমিনার, টেলিভিশন বিতর্ক ও মতামতপূর্ণ লেখায় পাকিস্তানজুড়ে আবারও জোরালো হয়েছে ‘নতুন প্রদেশ’ আলোচনায়।
আইপিপি-র নেতা আলীম খান বলেন, সিন্ধ, পাঞ্জাব, বালোচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখোয়া—প্রতিটি প্রদেশ থেকেই তিনটি করে নতুন প্রদেশ গড়ে তোলা যেতে পারে। তাঁর যুক্তি, “আমাদের চারপাশের দেশগুলোর রয়েছে একাধিক ছোট রাজ্য; পাকিস্তানেরও সেই পথে হাঁটা উচিত।”
তবে সমস্যা অন্য জায়গায়। শেহবাজ শরিফ সরকারের বড় জোটসঙ্গী পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) বরাবরই সিন্ধ ভাঙার বিরোধী। নভেম্বরেই সিন্ধের মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলি শাহ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সিন্ধ বিভক্ত করার কোনও চেষ্টাই মেনে নেবে না পিপিপি।
ইতিহাস বলে—প্রদেশ ভাগের প্রস্তাব বারবার উঠেছে, কিন্তু বাস্তব হয়নি
১৯৪৭-এ স্বাধীনতার সময় পাকিস্তানের ছিল পাঁচ প্রদেশ—পূর্ব বাংলা, পশ্চিম পাঞ্জাব, সিন্ধ, নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স (এনডব্লিউএফপি) ও বালোচিস্তান। ১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলা বাংলাদেশ হয়ে যাওয়ার পর বাকি কাঠামোয় বহুবারই ‘নতুন প্রদেশ’ প্রস্তাব উঠেছে। কিন্তু কোনওটিই বাস্তবায়িত হয়নি। এবার অবশ্য প্রস্তাবের পাশে দাঁড়িয়েছে শেহবাজ জোটের আরও কিছু দল, বিশেষত এমকিউএম–পি, যারা ২৮তম সংশোধনীর মাধ্যমে নতুন প্রদেশ গঠনের জন্য আইনি চাপ বাড়াতে চাইছে।
“সমাধান নয়, বাড়াতে পারে সংকট”—সতর্ক বিশেষজ্ঞরা
বিশেষজ্ঞদের একাংশ পরিষ্কার সতর্কবার্তা দিচ্ছেন—প্রদেশ সংখ্যা বাড়ানো মানেই সমস্যার সমাধান নয়। পাকিস্তানের প্রাক্তন আমলা ও প্রদেশীয় পুলিশ প্রধান সৈয়দ আখতার আলী শাহ লিখেছেন, “পাকিস্তানের সমস্যার মূলে প্রদেশের সংখ্যা নয়—গভীর শাসন-সংকট, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসনের অভাব।”
তিনি মনে করিয়ে দেন, আয়ুব খানের দুই-প্রদেশ ব্যবস্থা থেকে ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’—বহু পরীক্ষাই পাকিস্তান ইতিমধ্যেই করে ফেলেছে। কিন্তু কোনও ব্যবস্থাই বঞ্চনার অনুভূতি দূর করতে পারেনি। তাঁর মতে, কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করে নতুন প্রদেশ তৈরি করলে “অসমতা আরও বাড়তে পারে।”
পাকিস্তানি থিঙ্কট্যাঙ্ক পিলডাট-এর প্রধান আহমেদ বিলাল মেহবুব-ও ডনে লেখেন, অতীতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস মানুষের ক্ষোভই বাড়িয়েছে। তাঁর মন্তব্য, “বড় প্রদেশ সমস্যা নয়—বরং স্থানীয় স্তরে ক্ষমতা হস্তান্তরের অভাবই মূল সংকট।”
নতুন প্রদেশের তাড়া, কিন্তু পুরোনো সমস্যার পাহাড়
বিশেষজ্ঞদের মত একটাই—প্রদেশ বাড়ালেই সমাধান আসবে না, আগে চাই কার্যকর স্থানীয় সরকার, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি।
যখন গোটা দেশ বালোচিস্তান–পাখতুনখোয়ার নিরাপত্তা অস্থিরতা, অর্থনৈতিক ধস ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে হাঁটছে, তখন প্রশাসনিক বিভাজনের এই উদ্যোগ আদৌ পরিস্থিতি সামলাবে, নাকি আরও অস্থিরতা তৈরি করবে—সেই নিয়েই উঠছে বড় প্রশ্ন।










