সেনা-বিরোধী অবস্থান? ইমরান খানের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ মামলার ইঙ্গিত পাক সরকারের

পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন মোড় নিল। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়েরের ইঙ্গিত দিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সরকারের মুখপাত্র ও জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা…

Pakistan Political Crisis Imran Khan vs Army

পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন মোড় নিল। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়েরের ইঙ্গিত দিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সরকারের মুখপাত্র ও জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহ। সোমবার এক সাক্ষাৎকারে সানাউল্লাহ স্পষ্ট বলেন, “ইমরান খানের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা অস্বীকার করা যায় না।” সেনাবাহিনীর তরফে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, সরকার তার পূর্ণ সমর্থন করছে বলেও তিনি দাবি করেন।

Advertisements

আইএসপিআর-এর মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী প্রকাশ্যে ইমরানকে “জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি” বলে আক্রমণ করার এক সপ্তাহের মধ্যেই এই মন্তব্য আসে৷ পাকিস্তানের সামরিক স্থাপত্য ও ইমরান-পন্থীদের সংঘাত যে বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে, সানাউল্লাহর মন্তব্যে তা আরও স্পষ্ট।

   

আদিয়ালা জেলে ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করতে বাধা

মঙ্গলবার উত্তেজনা আরও তীব্র হয়। আদালত-নির্ধারিত সাক্ষাতের দিন হওয়া সত্ত্বেও আদিয়ালা জেলের দিকে যাওয়া সমস্ত রাস্তা পুলিশ ঘিরে ফেলে, ইমরান খানের বোনদের তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেওয়া হয়। এতে পিটিআই সমর্থকদের ক্ষোভ চরমে ওঠে।

সানাউল্লাহ বলেন, ইমরানের সাম্প্রতিক এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট—যা তিনি বোনের সঙ্গে জেলে সাক্ষাতের পর করেছেন—তা “উস্কানিমূলক” এবং সরকার সেটিকে জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থী বলেই ব্যাখ্যা করছে।

“নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই সিল করছে পিটিআই”—সানাউল্লাহ

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সানাউল্লাহ আরও দাবি করেন, পিটিআই নেতাদের বক্তব্য এখন সরাসরি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, এবং খুব শীঘ্রই “পূর্ণ শক্তি দিয়ে” তার জবাব দেওয়া হবে।

তাঁর কটাক্ষ, “পাকিস্তান তেহরিক-এ-ইনসাফ এখন আদিয়ালা তেহরিক-এ-ইনসাফে পরিণত হচ্ছে।”
তিনি আরও ভবিষ্যদ্বাণী করেন, পিটিআই নেতৃত্বের সংঘাতমুখী পথ অনুসরণ করতে দলের অনেকেই প্রস্তুত নন।

সেনা–স্থাপত্য বনাম ইমরান: সংঘাতের নতুন শিখর

ইমরান খানকে লক্ষ্য করে আইএসপিআর ডিরেক্টরের সাম্প্রতিক মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আহমেদ শরিফ চৌধুরীর বক্তব্য, “ইমরান খানের তৈরি করা অ্যান্টি-আর্মি বর্ণনা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্রমশ হুমকিতে পরিণত হয়েছে।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, “কে তুমি? কোন বার্তা দিতে চাও? নিজেকে কী ভাবো?”

ফিল্ড মার্শাল মুনির: ক্ষমতার অভূতপূর্ব কেন্দ্রীকরণ

২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সেনা–বৈরিতা চরমে। সেনাপ্রধান আসিম মুনির এখন ফিল্ড মার্শাল, দেশের সব সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বিত সর্বাধিনায়ক, এবং নতুন ২৭তম সংশোধনের মাধ্যমে আজীবন পদমর্যাদা, বিচারিক ইমিউনিটি ও বিস্তৃত ক্ষমতা পেয়েছেন। এই সংশোধন কার্যত পাকিস্তানের সেনা-আধিপত্যকে সংবিধানে স্থায়ী রূপ দিয়েছে।

ইমরান খান বরাবরই মুনিরকে “মানসিকভাবে অস্থির একনায়ক” বলে অভিযোগ করে এসেছেন। তিনি দাবি করছেন, তাঁর ওপর হওয়া নির্যাতন, হত্যা-চেষ্টা ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পিছনে সরাসরি মুনির-নেতৃত্বাধীন সেনা–স্থাপত্যই রয়েছে। অন্যদিকে মুনির-পন্থী শিবির ইমরানকে “মানসিকভাবে অসুস্থ” আখ্যা দিয়ে তাঁকেই জাতীয় নিরাপত্তা সংকট বলে প্রচার করছে।

বেলুচিস্তান–খাইবার পাখতুনখোয়ায়বিদ্রোহী হামলার উত্থান

রাজনৈতিক টানাপড়েনের পাশাপাশি বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া জুড়ে বিদ্রোহী ও জঙ্গি হামলা বেড়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে পরিস্থিতি আরও অস্থির।

দুই দশকের সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়ের দিকে পাকিস্তান

২০২৩ সালের আগস্ট থেকে আদিয়ালা জেলে বন্দি ইমরান খান ইতিমধ্যেই আল-কাদির ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১৪ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত। সাইফার মামলায় রাষ্ট্রগোপনীয়তা ফাঁসের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে ঝুলছে।

ইমরান-মুনির দ্বন্দ্বের সূচনা ২০১৯ সালে, যখন ইমরান মাত্র আট মাসের মধ্যে মুনিরকে আইএসআই প্রধান পদ থেকে সরিয়ে দেন। সেই ক্ষোভ এখন পাকিস্তানের রাজনীতিকে অভূতপূর্ব সংঘর্ষ, সামরিক আধিপত্য, বিদ্রোহী উত্থান ও গভীর মেরুকরণে ঠেলে দিয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষকদের মতে পাকিস্তানকে নিয়ে যাচ্ছে সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ফোরক ও অনিশ্চিত সময়ে।

Advertisements