শুক্রবার সন্ধ্যায় পশ্চিম নেপালে পরপর দুটি ভূমিকম্প (Nepal Earthquake) আঘাত হেনেছে। এই দুটি ভূমিকম্প মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে সংঘটিত হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ন্যাশনাল আর্থকোয়েক মনিটরিং সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ভূমিকম্পটি স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৮:০৭ মিনিটে জাজারকোট জেলায় আঘাত হানে, যার মাত্রা ছিল ৫.২। এর তিন মিনিট পরেই, অর্থাৎ সন্ধ্যা ৮:১০ মিনিটে, আরও শক্তিশালী ৫.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়।
দুটি ভূমিকম্পেরই কেন্দ্রস্থল ছিল জাজারকোট জেলার পানিক এলাকায়, যা নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৫২৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। এই ভূমিকম্পের কম্পন পশ্চিম নেপালের পার্শ্ববর্তী জেলাগুলি যেমন সুরখেত, দৈলেখ এবং কালিকোটেও অনুভূত হয়েছে। তবে, ভূমিকম্পের তীব্রতা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত কোনো প্রাণহানি বা উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
নেপাল ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত একটি দেশ। হিমালয় পর্বতমালার কাছাকাছি থাকার কারণে এখানে প্রায়ই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষের ফলে এই অঞ্চলে ভূ-কম্পনিক কার্যকলাপ বেশি দেখা যায়। শুক্রবারের এই ভূমিকম্পের পর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা দল সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। তারা পরবর্তী কম্পন (আফটারশক) বা কাঠামোগত ক্ষতির সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ করছে।
ভূমিকম্পের বিবরণ
ন্যাশনাল আর্থকোয়েক মনিটরিং সেন্টার জানিয়েছে, প্রথম ভূমিকম্পটি রিখটার স্কেলে ৫.২ মাত্রার ছিল এবং এটি সন্ধ্যা ৮:০৭ মিনিটে আঘাত হানে। এরপর মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি সংঘটিত হয়, যার মাত্রা ছিল ৫.৫। দুটি ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল জাজারকোট জেলার পানিক এলাকায় অবস্থিত বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই অঞ্চলটি পাহাড়ি এবং দুর্গম হওয়ায় সেখানে ত্রাণ বা উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তবে, এখনও পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের ক্ষতির খবর না আসায় স্থানীয় বাসিন্দারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।
কম্পনের প্রভাব
জাজারকোটের পাশাপাশি সুরখেত, দৈলেখ এবং কালিকোট জেলার বাসিন্দারা এই ভূমিকম্পের কম্পন স্পষ্টভাবে অনুভব করেছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কম্পনের সময় অনেকে আতঙ্কিত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে, ভূমিকম্পের তীব্রতা মাঝারি হওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা কম বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে।
নেপালের ভূমিকম্পের ইতিহাস
নেপালে ভূমিকম্প কোনো নতুন ঘটনা নয়। ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে ৭.৮ মাত্রার একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প দেশটিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, যাতে প্রায় ৯,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং লাখ লাখ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছিল। এছাড়াও, ২০২৩ সালের নভেম্বরে জাজারকোট জেলাতেই ৬.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার ফলে ১৫৩ জনের মৃত্যু হয় এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়। এই ঘটনাগুলি নেপালের ভূ-কম্পনিক ঝুঁকির কথা বারবার মনে করিয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম নেপালে গত ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো বড় মাত্রার ভূমিকম্প হয়নি। সর্বশেষ বড় ভূমিকম্পটি ১৫০৫ সালে সংঘটিত হয়েছিল। তবে, ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের মধ্যে ক্রমাগত সংঘর্ষের ফলে এই অঞ্চলে ৮ মাত্রারও বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন।
ভূমিকম্পের পর স্থানীয় প্রশাসন এবং ন্যাশনাল আর্থকোয়েক মনিটরিং সেন্টার সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা পরবর্তী কম্পনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের জন্য জাজারকোট ও আশপাশের এলাকায় জরিপ চালাচ্ছে। এছাড়াও, জরুরি ত্রাণ ও উদ্ধার দলকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
শুক্রবারের এই ভূমিকম্প নেপালের ভূ-কম্পনিক ঝুঁকির আরেকটি উদাহরণ। যদিও এবার বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো গেছে, তবুও এটি দেশটির বাসিন্দাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। ভূমিকম্প-প্রবণ এই অঞ্চলে ভবিষ্যৎ দুর্যোগের জন্য প্রস্তুতি এবং সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরও একবার সামনে এসেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সমন্বিত প্রচেষ্টায় নেপালকে এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য আরও সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।