ইসলাম ভুলে শিকড়ে ফিরে সূর্যের উপাসনা চায় ইরানের Gen-Z

iran-gen-z-rejecting-islam-pre-1979-identity

তেহরান থেকে লন্ডন ইরানের রাজনীতি ও সমাজে ফের একবার প্রবল আলোড়ন (Iran Gen Z)। ইসলামি শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, ধর্মীয় প্রতীকের প্রত্যাখ্যান এবং প্রাক্‌-১৯৭৯ ইরানের পরিচয় ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এই তিনটি প্রবণতা মিলিয়ে ইরানের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে Gen-Z, নতুন এক প্রতিবাদের ভাষা তৈরি করছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনে ইরান এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ইরানি প্রবাসীদের মধ্যে যে ঘটনাগুলি ঘটেছে, তা এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে লন্ডনে। ব্রিটেনের রাজধানীতে অবস্থিত ইরানের দূতাবাস ভবনের বারান্দায় উঠে এক বিক্ষোভকারী ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতাকা নামিয়ে দেন এবং অল্প সময়ের জন্য উত্তোলন করেন ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগের ঐতিহাসিক ‘লায়ন অ্যান্ড সান’ বা সিংহ-সূর্য পতাকা। এই পতাকা ইরানের প্রাচীন পারস্য ঐতিহ্য, রাজতন্ত্র ও ইসলাম-পূর্ব পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

   

আগামী বছরেই টুকরো হবে পাকিস্তান! বিস্ফোরক ভারতীয় সেনাকর্তা

ঘটনার সময় দূতাবাসের বাইরে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। পরে ব্রিটিশ পুলিশ হস্তক্ষেপ করে এবং কয়েকজনকে আটক করা হয়। তবে এই দৃশ্য ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে ইরান-বিরোধী আন্দোলনের এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

এর সমান্তরালেই ইরানের অভ্যন্তরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও বিরোধী সূত্র দাবি করছে। সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রবাসী ইরানি সংগঠনগুলির মতে, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। দেশের ৩১টি প্রদেশের অন্তত ১৭৫টির বেশি শহরে, প্রায় ৫০০-এরও বেশি স্থানে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। যদিও সরকারি ভাবে এই সংখ্যাগুলির পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি মেলেনি, তবু বিক্ষোভের ব্যাপ্তি নিয়ে সন্দেহ নেই।

এই আন্দোলনের আরেকটি দিক বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি নিশানা করা। বিভিন্ন রিপোর্ট ও ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বিক্ষোভকারীরা একাধিক মসজিদে আগুন লাগিয়েছেন বা ভাঙচুর করেছেন। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করা হয়েছে, শুধু তেহরানেই এক রাতে অন্তত ২৪টি মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ঘটনা ইরানের ইতিহাসে নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা, কারণ ইসলামি শাসনের ভিত্তিই যেখানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সেখানে মসজিদে আক্রমণ এক গভীর আদর্শগত বিদ্রোহের ইঙ্গিত দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের Gen-Z যারা ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া ও বৈশ্বিক সংস্কৃতির সঙ্গে বেড়ে উঠেছে। এই প্রজন্ম ইসলামি রাষ্ট্রের কঠোর সামাজিক নিয়ম, নারীদের ওপর বাধ্যতামূলক হিজাব, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব এবং অর্থনৈতিক সংকটে ক্লান্ত। তারা নিজেদের পরিচয় খুঁজছে ইসলামি বিপ্লবের বাইরের এক ইতিহাসে—যেখানে পারস্য সভ্যতা, সূর্যোপাসনা, জরথুস্ত্রীয় ঐতিহ্য এবং জাতীয়তাবাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

‘লায়ন অ্যান্ড সান’ পতাকার পুনরুত্থান সেই মনোভাবেরই প্রতিফলন। অনেক তরুণের চোখে এটি শুধু রাজতন্ত্রের প্রতীক নয়, বরং একটি ধর্মনিরপেক্ষ, সংস্কৃতি-কেন্দ্রিক ইরানের স্মারক। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া পোস্টে বহু তরুণ লিখছেন, “আমরা ইসলাম ছাড়ছি না শুধু, আমরা আমাদের শিকড়ে ফিরছি।”

তবে এই আন্দোলন কতটা সংগঠিত এবং এর ভবিষ্যৎ কী তা এখনও স্পষ্ট নয়। কঠোর দমন-পীড়নের জন্য পরিচিত ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ইতিমধ্যেই বহু জায়গায় কড়া ব্যবস্থা নিয়েছে বলে খবর। তবুও একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই আদর্শগত বিদ্রোহ ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। সূর্যের দিকে মুখ তুলে নিজেদের শিকড় খোঁজার এই ডাক ইরানকে কোন পথে নিয়ে যাবে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে বিশ্ব।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন