Home World ভারত–চিন সম্পর্কে ‘বিভ্রান্তি’ ছড়াচ্ছে আমেরিকা! সীমান্ত পরিস্থিতি ‘স্থিতিশীল’, দাবি বেজিং-এর

ভারত–চিন সম্পর্কে ‘বিভ্রান্তি’ ছড়াচ্ছে আমেরিকা! সীমান্ত পরিস্থিতি ‘স্থিতিশীল’, দাবি বেজিং-এর

hina Pentagon report reaction

বেজিং: আমেরিকার প্রতিরক্ষা দফতরের (পেন্টাগন) একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাল চিন। বৃহস্পতিবার বেজিং স্পষ্ট ভাষায় ওই রিপোর্ট খারিজ করে দিয়ে অভিযোগ করেছে, ভারত–চিন সীমান্তে উত্তেজনা কমার বিষয়টিকে ব্যবহার করে আমেরিকা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর বর্ণনা তৈরি করছে এবং বেজিং ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক নিয়ে ‘ভুয়ো আখ্যান’ ছড়াচ্ছে।

Advertisements

আমেরিকার ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ভারত–চিন সীমান্তে আপাত শান্ত পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বেজিং একদিকে আমেরিকা–ভারত ঘনিষ্ঠতা ঠেকানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করছে। এই বক্তব্যকে সরাসরি ‘বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে আক্রমণ করেছে চিন।

   

পেন্টাগনের রিপোর্ট বিকৃত

চিনের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র লিন জিয়ান এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, “পেন্টাগনের রিপোর্ট চিনের প্রতিরক্ষা নীতিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। এটি চিন ও অন্যান্য দেশের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায় এবং আমেরিকার সামরিক আধিপত্য বজায় রাখার অজুহাত খোঁজার প্রচেষ্টা। চিন এই রিপোর্টের তীব্র বিরোধিতা করছে।”

লিনের দাবি, ভারত–চিন সীমান্ত পরিস্থিতি বর্তমানে “সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল” এবং দু’দেশের মধ্যে যোগাযোগের চ্যানেল সচল রয়েছে। এই প্রেক্ষিতে তৃতীয় কোনও দেশের ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য’কে চিন মেনে নেবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।

অরুণাচল প্রসঙ্গ ও আমেরিকার দাবি

পেন্টাগনের রিপোর্টে অরুণাচল প্রদেশকে চিনের সম্প্রসারিত ‘কোর ইন্টারেস্ট’-এর অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ওই নথিতে অরুণাচলকে তাইওয়ান ও দক্ষিণ চিন সাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বিরোধের সঙ্গে একই কৌশলগত স্তরে রাখা হয়েছে। এই ব্যাখ্যাকে ঘিরে ভারত–চিন সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক জল্পনা তৈরি হয়েছে।

রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বৈঠকের ঠিক দু’দিন আগে লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (LAC)-এর অবশিষ্ট সংঘর্ষপূর্ণ এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে দু’দেশ একটি সমঝোতায় পৌঁছয়।

পেন্টাগনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সীমান্ত উত্তেজনা কমিয়ে চিন সম্ভবত ভারত–চিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে চায় এবং একই সঙ্গে আমেরিকা–ভারত ঘনিষ্ঠতা গভীর হওয়া আটকানোর কৌশল নিচ্ছে। যদিও রিপোর্টে এটাও স্বীকার করা হয়েছে, চিনের উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতের মধ্যে এখনও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস দু’দেশের সম্পর্ককে সীমিত করে রাখছে।

সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বেজিংয়ের অবস্থান

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে প্রশ্নের উত্তরে লিন জিয়ান বলেন, চিন নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ককে “কৌশলগত উচ্চতা ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি” থেকে দেখে। তাঁর কথায়, “আমরা যোগাযোগ জোরদার করতে, পারস্পরিক বিশ্বাস বাড়াতে, সহযোগিতা প্রসারিত করতে এবং মতপার্থক্য যথাযথভাবে সামাল দিতে প্রস্তুত। লক্ষ্য, একটি স্থিতিশীল ও সুস্থ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক।”

LAC পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন, সীমান্ত ইস্যু একান্তই ভারত ও চিনের মধ্যে বিষয় এবং বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে কাজানে মোদী–শি বৈঠকের পর সীমান্তে সেনা প্রত্যাহার চুক্তিকে দু’দেশই একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে তুলে ধরে। এরপর থেকেই নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক ও সামরিক আলোচনা শুরু হয়েছে।

পাকিস্তান প্রসঙ্গে চিন–আমেরিকা টানাপোড়েন

পেন্টাগনের রিপোর্টে আরও দাবি করা হয়েছে, চিন পাকিস্তানে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করছে এবং ইসলামাবাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ সহযোগিতা ক্রমশ বাড়াচ্ছে। এই অভিযোগকে তীব্র ভাষায় নাকচ করেছে চিনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মুখপাত্র ঝাং শিয়াওগাং বলেন, “এই রিপোর্ট চিনের জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছে। চিনের সামরিক আধুনিকীকরণ নিয়ে ভিত্তিহীন জল্পনা করা হয়েছে এবং স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা কার্যকলাপকে কালিমালিপ্ত করা হয়েছে।”

তিনি অভিযোগ করেন, রিপোর্টটি ‘ভূ-রাজনৈতিক পক্ষপাত’ ও তথাকথিত ‘চিনের সামরিক হুমকি’কে অতিরঞ্জিত করে আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। আমেরিকাকে ‘ভুয়ো আখ্যান তৈরি’ ও সংঘাত উসকে দেওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বানও জানায় বেজিং।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিতর্ক কেবল একটি রিপোর্ট ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়। ভারত–চিন সীমান্ত শান্তি, আমেরিকা–ভারত কৌশলগত সম্পর্ক এবং পাকিস্তানকে ঘিরে চিনের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নীতির প্রশ্ন—এই তিনটি সমীকরণই এখন এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি করছে।

Advertisements