চিনের চিকিৎসকরা বুধবার ঘোষণা করেছেন যে, তারা প্রথমবারের মতো একটি জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের লিভার একজন মস্তিষ্ক-মৃত মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন (Pig Liver Transplant) করেছেন। এই যুগান্তকারী ঘটনা ভবিষ্যতে জীবন রক্ষাকারী অঙ্গদানের একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। শূকরের অঙ্গগুলোকে সবচেয়ে উপযুক্ত প্রাণীজ দাতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কয়েকজন জীবিত রোগীর শরীরে শূকরের কিডনি বা হৃদয় প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। তবে লিভারর ক্ষেত্রে এটি অনেক বেশি জটিল ছিল এবং এর আগে কখনো মানুষের শরীরে পরীক্ষা করা হয়নি।
বিশ্বজুড়ে লিভারর দানের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে গবেষকরা আশা করছেন যে, জিন-সম্পাদিত শূকরের লিভার গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য অন্তত সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে মানব দাতার অপেক্ষায় রয়েছেন। চিনের শিয়ানে অবস্থিত ফোর্থ মিলিটারি মেডিকেল ইউনিভার্সিটির চিকিৎসকরা বিখ্যাত জার্নাল ‘নেচার’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় এই অভূতপূর্ব সাফল্যের কথা জানিয়েছেন।
গবেষণা অনুযায়ী, গত ১০ মার্চ ২০২৪ তারিখে শিয়ানের এই হাসপাতালে একটি ক্ষুদ্রাকৃতির শূকরের লিভার একজন মস্তিষ্ক-মৃত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। এই শূকরের লিভারর ছয়টি জিন সম্পাদনা করা হয়েছিল, যাতে এটি মানুষের শরীরে দাতা হিসেবে আরও উপযোগী হয়। পরীক্ষাটি ১০ দিন পর রোগীর পরিবারের অনুরোধে সমাপ্ত করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই প্রক্রিয়ায় তারা কঠোর নৈতিক নির্দেশিকা মেনে চলেছেন।
‘ব্রিজ অর্গান’ হিসেবে সম্ভাবনা
এই প্রতিস্থাপনে রোগীর মূল লিভার অপসারণ করা হয়নি। বরং শূকরের লিভারটি একটি সহায়ক প্রতিস্থাপন (অক্সিলিয়ারি ট্রান্সপ্লান্ট) হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। গবেষকদের আশা, এই ধরনের প্রতিস্থাপন অসুস্থ ব্যক্তিদের বিদ্যমান লিভারকে সহায়তা করতে পারে এবং মানব দাতার জন্য অপেক্ষারত রোগীদের জন্য একটি ‘ব্রিজ অর্গান’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
১০ দিনের এই পরীক্ষার সময় চিকিৎসকরা শূকরের লিভারর রক্ত প্রবাহ, পিত্ত উৎপাদন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রতিক্রিয়া এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করেছেন। গবেষণার সহ-লেখক এবং শিয়ান হাসপাতালের চিকিৎসক লিন ওয়াং এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “শূকরের লিভারটি খুব ভালোভাবে কাজ করেছে এবং সুষ্ঠুভাবে পিত্ত নিঃসরণ করেছে। এছাড়া এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন অ্যালবুমিনও উৎপাদন করেছে।” তিনি আরও বলেন, “এটি একটি বড় সাফল্য, যা ভবিষ্যতে লিভারর সমস্যায় ভোগা রোগীদের জন্য সহায়ক হতে পারে।”
জটিলতা এবং সীমাবদ্ধতা
অন্যান্য গবেষকরা এই সাফল্যের প্রশংসা করলেও সতর্ক করে বলেছেন যে, এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের একটি পদক্ষেপ। এই পরীক্ষা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি যে শূকরের লিভার মানুষের লিভারর পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হতে পারবে কি না। লিন ওয়াং ব্যাখ্যা করেন, হৃদয় যেখানে শুধু রক্ত পাম্প করে, সেখানে লিভারর কার্যকারিতা অনেক বেশি জটিল। লিভার শরীরের রক্ত ফিল্টার করে, ওষুধ বা অ্যালকোহলের মতো উপাদান ভেঙে ফেলে এবং পিত্ত উৎপাদন করে, যা বর্জ্য দূর করে এবং চর্বি ভাঙতে সাহায্য করে।
এই পরীক্ষায় দেখা গেছে, শূকরের লিভার মানুষের লিভারর তুলনায় অনেক কম পরিমাণে পিত্ত এবং অ্যালবুমিন উৎপাদন করেছে। লিন জানান, এই বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে ১০ দিনের বেশি সময় ধরে শূকরের লিভারর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা দরকার। তিনি জানান, পরবর্তী ধাপে তারা জীবিত মানুষের শরীরে এই জিন-সম্পাদিত শূকরের লিভার পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিস্থাপন বিশেষজ্ঞ পিটার ফ্রেন্ড, যিনি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, এই ফলাফলকে “মূল্যবান এবং চিত্তাকর্ষক” বলে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “এটি নিকট ভবিষ্যতে মানব দাতার লিভারর প্রতিস্থাপন হতে পারে না। তবে এটি জিনগতভাবে পরিবর্তিত লিভারর মানুষের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যতে লিভার বিকল রোগীদের সহায়তা প্রদানের সম্ভাবনা দেখায়।”
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
লিন ওয়াং জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকদের সঙ্গে সহযোগিতা এই সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি বলেন, “সত্যি বলতে, আমরা যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকদের গবেষণা থেকে অনেক কিছু শিখেছি।” গত বছর পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা একটি শূকরের লিভার মস্তিষ্ক-মৃত রোগীর শরীরের বাইরে সংযুক্ত করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে শূকরের হৃদয় প্রতিস্থাপিত দুজন রোগীই মারা গেছেন। তবে ৫৩ বছর বয়সী টোয়ানা লুনি গত ২৫ নভেম্বর ২০২৪-এ শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের পর আলাবামায় সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরেছেন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এই সাফল্য বিশ্বব্যাপী অঙ্গ সংকটের সমাধানে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। চিনে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ লিভারর রোগে ভুগছেন, এবং দাতার অভাবে অনেকেই চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। শূকরের জিন-সম্পাদিত অঙ্গগুলো এই সমস্যার একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে। তবে এর জন্য আরও গবেষণা, দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ এবং নৈতিক বিবেচনার প্রয়োজন।