বাংলাদেশে (Bangladesh) সংখ্যালঘু নির্যাতন ও গণপিটুনির ঘটনায় ফের নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এল। ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা এলাকায় হিন্দু গার্মেন্টস কর্মী দীপু চন্দ্র দাসকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা ও পরে দেহ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি নিয়ে এবার ভিন্ন দাবি করল নিহতের পরিবার। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ড কোনও ধর্ম অবমাননার জেরে নয়, বরং কর্মক্ষেত্রের দীর্ঘদিনের বিবাদ এবং পদোন্নতি সংক্রান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল।
গত সপ্তাহে Pioneer Knitwears (BD) Limited নামের একটি গার্মেন্টস কারখানার বাইরে শতাধিক মানুষের হাতে lynching-এর শিকার হন ২৭ বছরের দীপু চন্দ্র দাস। ঘটনাস্থলের ভিডিও ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, কারখানা থেকে জোর করে টেনে বের করে আনা হচ্ছে দীপুকে, রাস্তায় ফেলে নির্মমভাবে মারধর করা হচ্ছে। শেষপর্যন্ত তাঁর দেহ একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
নিহতের ভাই আপু রবি দাস জানিয়েছেন, দীপু ওই কারখানায় ফ্লোর ম্যানেজার পদে কর্মরত ছিলেন এবং সম্প্রতি সুপারভাইজার পদে পদোন্নতির জন্য একটি নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। এই পদোন্নতিকে কেন্দ্র করেই সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ শুরু হয়।
ঢাকা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আপু রবি দাস বলেন, ঘটনার দিন সকালে কারখানার ভেতরেই তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। এরপর দীপুকে জোর করে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। সেই সময়ই হঠাৎ করে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়।
পরিবারের দাবি, দীপু ক্ষমা চেয়েও রক্ষা পাননি। তাঁকে মারধর করে কারখানা থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে এক বন্ধু ফোন করে জানায়, দীপুকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরেকটি ফোনে জানানো হয়, দীপু আর বেঁচে নেই।
স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার তোফাজ্জেল হোসেনও এই ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা, ওভারটাইম, কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা এবং কর্তৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দীপুর সঙ্গে কয়েকজন কর্মীর বিরোধ চলছিল।
তিনি বলেন, এটি কোনও আকস্মিক ধর্মীয় উন্মাদনার ফল নয়। ধীরে ধীরে একটি ষড়যন্ত্র তৈরি করা হয়েছিল যাতে তাঁকে কারখানা থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। তাঁর আরও দাবি, কারখানা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে দীপুকে হত্যা করা হয় এবং পরে দেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ পুলিশ ও Rapid Action Battalion (RAB) জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত দীপুর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, এই অভিযোগ মূলত মুখে-মুখে রটানো গুজবের উপর ভিত্তি করে।
RAB কমান্ডার নাইমুল হাসানের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত হয় বিকেল চারটে নাগাদ। কারখানার ফ্লোর ইনচার্জ তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করে উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দেয়। ধর্ম অবমাননার বিষয়টি অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং কেউই স্পষ্ট করে বলতে পারেনি তিনি কী বলেছিলেন।
এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিহতের পরিবার ভালুকা থানায় ১৪০ থেকে ১৫০ জন অজ্ঞাতপরিচয়ের ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। তদন্ত এখনও চলছে এবং আরও গ্রেফতারের সম্ভাবনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছর আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে একাধিক সহিংস ঘটনার অভিযোগ সামনে এসেছে। দীপু চন্দ্র দাসের মৃত্যু সেই উদ্বেগকে আরও গভীর করল।


