ঢাকা: প্রায় সতেরো বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজধানীতে আয়োজিত জনসভা থেকে তিনি ঘোষণা করেন, বাংলাদেশ “দু’বার মুক্ত হয়েছে”—একবার ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে, আরেকবার ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে মুহূর্তেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।
জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে তারেক রহমান একদিকে যেমন ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান, তেমনই ২০২৪ সালের আন্দোলনকে “গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই” হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, “১৯৭১ সালে আমরা দেশকে মুক্ত করেছিলাম। ২০২৪ সালে মানুষ আবার দেশকে মুক্ত করেছে।” এই মন্তব্যে সমর্থকদের মধ্যে প্রবল উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
বক্তব্যে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপরেখাও স্পষ্ট করেন বিএনপি নেতা। তিনি বলেন, বিএনপি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে চায়—যেখানে সব সম্প্রদায়, সব জাতিগোষ্ঠীর সমান অংশগ্রহণ থাকবে। ঐক্য, প্রতিনিধিত্ব এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধই হবে আগামী দিনের রাজনীতির মূল ভিত্তি। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক বিভাজন নয়, বরং সামাজিক সংহতিই দেশকে স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যেতে পারে।
সম্প্রতি নিহত বিএনপি নেতা ওসমান হাদির কথাও স্মরণ করেন তারেক রহমান। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, ওসমান হাদি একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন এবং সেই বিশ্বাসেই নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। “গণতন্ত্রে বিশ্বাস রেখেই তিনি প্রাণ দিয়েছেন,” বলেন তারেক রহমান, পাশাপাশি অঙ্গীকার করেন—দলের লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি পুনর্গঠন।
ভাষণে মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, তাঁরও “একটি পরিকল্পনা” আছে—শান্তি, শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় ভর করে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার। বিএনপি সেই লক্ষ্যেই নিরলসভাবে কাজ করবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থান করার পর ৬০ বছর বয়সে তাঁর দেশে ফেরা শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়, বরং বিরোধী রাজনীতির শক্তি পুনর্গঠনের ইঙ্গিত বলেও ধরা হচ্ছে। ২০০৮ সাল থেকে বিদেশে থাকা তারেক রহমান বরাবরই দাবি করে এসেছেন, তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার।
বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তারেক রহমান শীঘ্রই দলের পূর্ণ নেতৃত্ব গ্রহণ করতে পারেন বলে ইঙ্গিত মিলছে। বয়স ও অসুস্থতার কারণে রাজনীতি থেকে অনেকটাই সরে থাকা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর উত্থান বিএনপির ভবিষ্যৎ দিশা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেই মত রাজনৈতিক মহলের।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং তাঁর “দু’বার মুক্তি”-র মন্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক, নতুন সমীকরণ এবং নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিল। এখন দেখার, এই প্রত্যাবর্তন আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কী ধরনের পরিবর্তন আনে।


