দীর্ঘ সতেরো বছরের নির্বাসনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের মাটিতে ফিরলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁর আগমন শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের পুনরাগমন বলেই দেখছে রাজনৈতিক মহল।
২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লন্ডনের উদ্দেশে দেশ ছেড়েছিলেন তারেক। তার আগে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির মামলায় প্রায় দেড় বছর কারাবন্দি ছিলেন তিনি। ২০০৭ সালের ১/১১ জরুরি অবস্থার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নাটকীয় পালাবদল ঘটে, তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিলেন খালেদা-পুত্র। মুক্তির পরপরই দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘ সময় ব্রিটেনেই স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে স্বেচ্ছানির্বাসনে কাটান তিনি।
সেই সময় রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা ছিল, সেনা নেতৃত্বের সঙ্গে একপ্রকার সমঝোতার সূত্র ধরেই তারেকের বিদেশযাত্রা। প্রয়াত বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদের লেখা বইয়ে সেই ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও, খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান কেউই কখনও প্রকাশ্যে এমন কোনও শর্তের কথা স্বীকার করেননি। বরং তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বের দাবি ছিল, চিকিৎসা ও পড়াশোনার কারণেই লন্ডনে গিয়েছিলেন তারেক।
২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের বিপুল জয়ের পর তারেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়। ২০০৪ সালের ২১ অগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার মামলাতেও তাঁর নাম জড়ায়। তবে ২০২৪ সালের অগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের পর একে একে সমস্ত মামলা থেকে অব্যাহতি পান তিনি। সেই পর্ব থেকেই তাঁর দেশে ফেরার সম্ভাবনা জোরালো হতে শুরু করে।
দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকলেও বিএনপির সাংগঠনিক রাশ তারেকের হাতেই ছিল। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর লন্ডন থেকেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে রাজনৈতিক দিশা নির্ধারণ করেন তিনি। দলের তৃণমূল স্তরের কর্মীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কখনও বিচ্ছিন্ন হয়নি বলেই দাবি বিএনপি সূত্রের।
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ‘হাওয়া ভবন’ ঘিরে যে সমান্তরাল ক্ষমতাকেন্দ্রের অভিযোগ উঠেছিল, তা তারেকের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়। যদিও বিএনপি বারবার দাবি করেছে, সেসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
বর্তমানে অসুস্থ খালেদা জিয়া ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি, সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন তারেক রহমান। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় বিএনপি কার্যত একক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই মাঠে নামছে। ফলে তারেকের প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে দলের অন্দরে প্রত্যাশা যেমন তুঙ্গে, তেমনই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও প্রবল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে সতর্ক নজর রাখছে প্রতিবেশী ভারতও। কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, জামায়াতে ইসলামির মতো কট্টরপন্থী শক্তির প্রভাব সামাল দিতে আপাতত মধ্যপন্থী নেতৃত্ব হিসেবে তারেক রহমানই বিএনপির সবচেয়ে বড় ভরসা। তবে আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক স্থিতাবস্থা ফেরাতে তিনি কতটা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারবেন, তা নিয়েই প্রশ্নচিহ্ন রেখে দিচ্ছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে চলেছে, তার প্রভাব শুধু ঢাকাতেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক পরিসরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।


