বাংলাদেশ: তারেক রহমানের ‘প্ল্যান’! হিন্দুদের নিরাপত্তা ও ভারতের জন্য কী বার্তা?

ঠিক ৬০ বছর আগে ওয়াশিংটনের লিঙ্কন মেমোরিয়ালে দাঁড়িয়ে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র শুনিয়েছিলেন তার বিখ্যাত ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ (আমার একটি স্বপ্ন আছে) ভাষণ। ঠিক…

Tarique Rahman I have a plan speech

ঠিক ৬০ বছর আগে ওয়াশিংটনের লিঙ্কন মেমোরিয়ালে দাঁড়িয়ে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র শুনিয়েছিলেন তার বিখ্যাত ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ (আমার একটি স্বপ্ন আছে) ভাষণ। ঠিক সেই ভাষণের আদলে এবং কাকতালীয়ভাবে একই সময়সীমার (১৭ মিনিট) বক্তৃতায় নিজের রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরলেন বিএনপি-র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫) দেশের মাটিতে পা রেখেই তিনি ঘোষণা করলেন, “আমার একটি পরিকল্পনা (আই হ্যাভ এ প্ল্যান) আছে।”

Advertisements

মাটি ছুঁয়ে আবেগঘন প্রত্যাবর্তন

বৃহস্পতিবার ঢাকা বিমানবন্দরে যখন তারেক রহমান অবতরণ করেন, তখন সেখানে অপেক্ষমাণ লাখো জনতা। বিমান থেকে নামার পর এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়। ৬০ বছর বয়সী এই নেতা জুতো খুলে খালি পায়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন এবং দেশের মাটি তুলে নিয়ে মাথায় ঠেকান। ২০০৮ সাল থেকে প্রবাসে থাকা নেতার এই ‘ঘর ওয়াপসি’ ছিল প্রতীকী ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অভ্যর্থনা মঞ্চে নিজের জন্য রাখা বিশেষ চেয়ার সরিয়ে দিয়ে সাধারণ প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, আগামীর নেতৃত্বে ‘সিংহাসন’ নয়, জনসেবাই হবে মূল লক্ষ্য।

   

তারেক রহমানের ‘প্ল্যান’: অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ

৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে বাংলাদেশে যে অস্থিরতা ও মব অ্যাটাক চলছে, তার প্রেক্ষিতে তারেক রহমানের ভাষণ ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট করে বলেন-

নিরাপদ বাংলাদেশ: যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে।

ধর্মীয় সম্প্রীতি: মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান-সবার মিলিত অংশগ্রহণে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার ডাক দিয়েছেন তিনি।

আইন-শৃঙ্খলা: ওসমান হাদির মৃত্যুর পর দেশে যে অরাজকতা তৈরি হয়েছে, তা দমনে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

সংখ্যালঘু সুরক্ষা ও উদ্বেগের পরিসংখ্যান

তারেক রহমান যখন অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের কথা বলছেন, তখন দেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতির চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসেই বাংলাদেশে ৩৪২টি ধর্ষণের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে (HRCBM-এর রিপোর্ট অনুযায়ী), যার বড় অংশই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। গত এক সপ্তাহে দিপু চন্দ্র দাস এবং অমৃত মন্ডলের হত্যাকাণ্ডে জনমনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। তারেক রহমান সরাসরি এই ঘটনাগুলোর নিন্দা না করলেও, বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে কোনো প্রকার উস্কানি বা সহিংসতা বরদাস্ত করা হবে না।

ভারত ও বিদেশ নীতি: ‘দিল্লিও নয়, পিন্ডি-ও নয়’

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন দিল্লির জন্যও স্বস্তির হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির সাথে ভারতের শীতল সম্পর্ক থাকলেও, সাম্প্রতিককালে নরেন্দ্র মোদীর সাথে উষ্ণ বার্তা বিনিময় এবং জামায়াতে ইসলামীর থেকে দূরত্ব বজায় রাখার কৌশল বিএনপির ভাবমূর্তিতে পরিবর্তন এনেছে। তারেক রহমানের সাফ কথা, “দিল্লি নয়, পিন্ডি (রাওয়ালপিন্ডি) নয়; সবার আগে বাংলাদেশ।” ভারতের জন্য স্বস্তির বিষয় হলো, তারেক রহমান উগ্রবাদের বদলে একটি উদার ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর জোর দিচ্ছেন।

নির্বাচনী সমীকরণ

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় জনমত জরিপে বিএনপি-ই এখন শীর্ষ দাবিদার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এবং উগ্রপন্থী দলগুলোর দৌরাত্ম্যের মাঝে তারেক রহমানের এই ‘প্ল্যান’ কতোটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Advertisements