ফরিদপুর জিলা স্কুলের ১৮৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ঐতিহাসিক উদযাপন শেষ হলো এক নজিরবিহীন তাণ্ডব ও রক্তপাতের মধ্য দিয়ে। শুক্রবার রাতে কিংবদন্তি রকস্টার নগরবাউল জেমসের কনসার্ট শুরু হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী অনুষ্ঠানস্থলে হামলা চালায়। এতে ইটের আঘাতে অন্তত ২০ জন ছাত্র আহত হয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে কনসার্ট বাতিল করে দেয়৷
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্কুল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গিয়েছে, জিলা স্কুলের গৌরবময় ১৮৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের শেষ আকর্ষণ ছিল জেমসের কনসার্ট। শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে জেমস যখন মঞ্চে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন একদল বহিরাগত জোরপূর্বক ভেন্যুতে প্রবেশের চেষ্টা করে। নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের বাধা দিলে শুরু হয় তুলকালাম।
হামলাকারীরা ‘নারায়ে তাকবীর’ স্লোগান দিয়ে অনুষ্ঠানস্থলের চারপাশ থেকে মঞ্চ ও দর্শকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও পাথর ছুড়তে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দমুখর পরিবেশ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রাণের ভয়ে হাজার হাজার প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন।
আহত ও জেমসের নিরাপত্তা
সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন সামনের সারিতে থাকা শিক্ষার্থীরা। ইট ও পাথরের আঘাতে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন ছাত্রের মাথা ফেটে গিয়েছে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর চোট লেগেছে। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হামলার তীব্রতা বাড়লে জেমস ও তার ব্যান্ড সদস্যদের বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনীতে দ্রুত অনুষ্ঠানস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। জেমস অক্ষত থাকলেও তার বাদ্যযন্ত্র ও মঞ্চের সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও আয়োজকদের বক্তব্য
পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যাওয়ায় রাত ১০টার দিকে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে অনুষ্ঠান বাতিল বলে ঘোষণা করেন আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ড. মোস্তাফিজুর রহমান শামীম। প্রচার ও মিডিয়া উপ-কমিটির আহ্বায়ক রাজিবুল হাসান খান বলেন, “আমরা সব প্রস্তুতি শেষ করেছিলাম, কিন্তু হঠাৎ এই অতর্কিত হামলা আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে। কেন বা কারা এই হামলা চালিয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা বাধ্য হয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করেছি।”
সাংস্কৃতিক চর্চায় বাধা ও উদ্বেগ
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী আগে থেকেই এই সঙ্গীত অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করে আসছিল এবং গান-বাজনা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিল। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর এই নগ্ন হামলার ঘটনায় সারা দেশে শিল্পপ্রেমী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
দীর্ঘ ঐতিহ্যের জিলা স্কুল
১৮৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত ফরিদপুর জিলা স্কুল অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন বিদ্যাপীঠ। গত বৃহস্পতিবার বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও শপথের মাধ্যমে শুরু হওয়া উৎসবটি এমন কলঙ্কিত অধ্যায়ের মাধ্যমে শেষ হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
বর্তমানে এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় জড়িত কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করার খবর পাওয়া যায়নি।


