
ঢাকা: বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার আবহে ফের রক্তাক্ত সংখ্যালঘু হিন্দু সমাজ। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের দুই প্রান্তে পৃথক হামলায় প্রাণ হারালেন দুই হিন্দু পুরুষ, একজন মুদিখানার দোকানি, অন্যজন কর্মরত সাংবাদিক। একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ফের গভীর প্রশ্নের মুখে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা।
দোকানে হামলা
সোমবার রাতে রাজধানী ঢাকা সংলগ্ন নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলাধীন চারসিন্দুর বাজারে প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন করা হয় শরৎ চক্রবর্তী মণিকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, প্রতিদিনের মতোই নিজের মুদিখানার দোকান চালাচ্ছিলেন তিনি। আচমকাই জনবহুল বাজারে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাঁর উপর হামলা চালায়। গুরুতর জখম অবস্থায় স্থানীয়রা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু রক্তক্ষরণে পথেই কিংবা হাসপাতালে পৌঁছনোর পর তাঁর মৃত্যু হয়।
তীব্র আতঙ্ক Minority killings in Bangladesh
ব্যস্ত বাজার এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিহতের এক আত্মীয় জানান, শরৎ চক্রবর্তী ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনকারী মানুষ, কারও সঙ্গে তাঁর কোনও ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। উল্টে তিনি সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। গত ১৯ ডিসেম্বর ফেসবুকে তিনি লিখেছিলেন,“চারদিকে আগুন, চারদিকে হিংসা। আমার জন্মভূমি যেন মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হয়েছে।” সেই আশঙ্কারই যেন রক্তাক্ত বাস্তব রূপ পেল তাঁর মৃত্যুতে।
প্রতিবেশীদের মতে, শরৎ ছিলেন শান্ত, মানবিক ও সমাজসচেতন। তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই হত্যার পেছনে কোনও ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, বরং তাঁর হিন্দু পরিচয়ই মূল কারণ। উল্লেখযোগ্যভাবে, শরৎ চক্রবর্তী একসময় দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মরত ছিলেন। কয়েক বছর আগে দেশে ফিরে নরসিংদী শহরের ব্রাহ্মণদী এলাকায় বাড়ি তৈরি করে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন।
যশোরে আরও এক মৃত্যু
এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগেই আরেকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটে যশোর জেলায়। মনিরামপুর উপজেলার কোপালিয়া বাজারে সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা নাগাদ প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করা হয় ৪৫ বছরের রানা প্রতাপকে। তিনি স্থানীয় একটি সংবাদপত্রের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বাজারে উপস্থিত অবস্থায় তাঁকে লক্ষ্য করে একাধিক রাউন্ড গুলি চালানো হয়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁর।
মনিরামপুর থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেহ উদ্ধার করে। থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক রাজিউল্লাহ খান জানান, ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং দুষ্কৃতীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত চলছে।
ক্রমশ লম্বা হচ্ছে তালিকা
এই দুই মৃত্যু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর চালানো একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার তালিকাকে আরও দীর্ঘ করল। এর আগে গার্মেন্টস শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। অমৃত মণ্ডলের মৃত্যুর খবরও উঠে আসে অশান্তির মধ্যেই। ময়মনসিংহে বজেন্দ্র বিশ্বাস গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। গত ৩১ ডিসেম্বর শরীয়তপুরে হিন্দু ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে ছুরি মেরে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়, যা আন্তর্জাতিক স্তরেও নিন্দার ঝড় তোলে।
ক্রমাগত এই হত্যাকাণ্ড সত্ত্বেও দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপের অভাব প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বাংলাদেশের বর্তমান অস্থির বাস্তবতায় সংখ্যালঘু হিন্দু সমাজ ক্রমশ আরও অনিশ্চিত ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছে, যার অভিঘাত শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও গভীর উদ্বেগের বার্তা দিচ্ছে।
Bangladesh: Recent violence in Bangladesh led to the tragic deaths of two Hindu men within twenty-four hours. A businessman in Narsingdi and a journalist in Jashore were brutally targeted. These killings raise urgent questions regarding minority security.










