
কুষ্টিয়া, ২৯ নভেম্বর: বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের একটা জীবন্ত প্রতীক, কুষ্টিয়ার লালন শাহের মাজার। এই মাজার আজ সঙ্কটের মুখে। এখানে আজ মৌলবাদীদের হুঁশিয়ারির ছায়া পড়েছে। লালন ফকির, যিনি লালন শাহ, শাইজি বা লালন ফকির নামে পরিচিত, তাঁর কবর ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা করছে দেশের কট্টরপন্থী ইসলামপন্থী গোষ্ঠী। এই দর্শনবিদ, কবি এবং আধ্যাত্মিক নেতার মানবতাবাদী চিন্তাধারা জাতি, বর্ণ, ধর্মের সকল পার্থক্য প্রত্যাখ্যান করে।
কিন্তু শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে দেশে যে ধর্মীয় চরমপন্থের উত্থান দেখা যাচ্ছে, তাতে লালনের মতো সুফি সাধকদের উপর আঘাত বাড়ছে। স্থানীয় বাউল সম্প্রদায়ের লোকেরা ভয়ে কাঁপছেন, আর সাংস্কৃতিক কর্মীরা এটাকে একটা বড় ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করছেন। লালন শাহের জন্ম ১৭৭৪ সালে, মৃত্যু ১৮৯০ সালে। তিনি বাউল সম্প্রদায়ের এক অমর নক্ষত্র, যাঁর গানগুলোতে ধর্মের সীমানা অতিক্রম করে মানুষের মিলনের কথা বলা হয়েছে। “সব লোকের মাঝে একই আত্মা” – এই চিন্তা লালনের মূলে।
দেশ জুড়ে জিহাদের ডাক দিয়ে বিতর্কিত জমিয়ত প্রধান মাদানি
তাঁর দর্শন হিন্দু-মুসলিম, উচ্চ-নিম্নের বোঝা ছিঁড়ে ফেলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে আধুনিক কবিরা সকলেই লালনের প্রভাবে আলোকিত হয়েছেন। কুষ্টিয়ার ছৌরিয়া গ্রামে তাঁর আখড়া, যেখানে কবরটি অবস্থিত, সেটা হাজারো ভক্তের তীর্থস্থান। প্রতি বছর ডল পূর্ণিমা এবং কার্তিক সংক্রান্তিতে লালন মেলা হয়, যেখানে বাউল গায়করা তাঁর গান গেয়ে জীবনের সার্থকতা খুঁজে নেন। কিন্তু এখন এই স্থানটি হুমকির মুখে।
স্থানীয় বাউল গায়ক ফকির নাহির শাহ বলছেন, “লালনের গান তো শুধু শব্দ নয়, এতে জ্ঞানের আলো। কিন্তু এই মৌলবাদীরা সঙ্গীতকেই হারাম বলে। আমরা ভয়ে গান গাইতে পারছি না।” কুষ্টিয়া বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত, রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি এবং মীর মশাররফ হোসেনের বাড়িঘর এখানে। কিন্তু লালনের মাজার যদি ভাঙা হয়, তাহলে এই ঐতিহ্যের উপর কালো ছায়া পড়বে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান লক্ষণীয়।
হেফাজতে ইসলামের মতো সংগঠনগুলো সুফি শ্রাইন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে সক্রিয়। সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ ফরিদপুরের লালন আনন্দধামে অজ্ঞাত হামলাকারীরা লালনের প্রতিমা, বই এবং সঙ্গীত যন্ত্র ভেঙে দিয়েছে। কুমারখালীতে রশিদিয়া দরবার শরীফে মব অ্যাটাক হয়েছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ টাঙ্গাইলের মধুপুরে লালনের স্মরণ অনুষ্ঠান হেফাজতে ইসলামের চাপে বাতিল হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে লালন উৎসব বন্ধ হয়েছে হিংসাত্মক হুমকির কারণে।
আগস্ট ২০২৫-এ কুষ্টিয়ায় সুফি গায়ক জামাল বলেছেন, “আমরা দশকের পর দশক ধরে গান গাইছি, কিন্তু এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়।” বাংলাদেশ বাউল অ্যান্ড ফোক আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি সর্দার হিরক রাজা জানিয়েছেন, গত বছর থেকে ৩০০-এর বেশি সঙ্গীত অনুষ্ঠান বাতিল হয়েছে মৌলবাদীদের চাপে।
অক্টোবরে ঢাকা এয়ারপোর্টের চৌরাস্তায় লালনের অন্তর্ভুক্ত বাউল গায়কদের পাঁচটি প্রতিমা ভাঙতে হয়েছে চরমপন্থীদের চাপে। নভেম্বর ২০২৪-এ নারায়ণগঞ্জে লালনের বার্ষিক অনুষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। এসব ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, সুফি ঐতিহ্যকে ‘অ-ইসলামিক’ বলে চরমপন্থীরা আক্রমণ করছে।




