নেপথ্যের ছায়াযুদ্ধ! বাংলাদেশের অস্থিরতাকে কীভাবে কাজে লাগাচ্ছে ISI?

ISI role in Bangladesh election unrest

ঢাকা: বাংলাদেশে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের আগে যে অস্থিরতা ক্রমশ গভীরতর হচ্ছে, তা আর কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই উত্তেজনার পেছনে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বহিরাগত শক্তির সুপরিকল্পিত হস্তক্ষেপ। গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক মহলের মূল্যায়ন অনুযায়ী, পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই এবার প্রকাশ্য নেতৃত্বে না থেকে, কৌশলগত নীরবতায় থেকে পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে—যা জুলাই ২০২৪-এর অস্থিরতার তুলনায় অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও বিপজ্জনক।

এই নতুন উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে ছাত্রনেতা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু। গত শুক্রবার ঢাকায় নির্বাচনী প্রচারের সূচনালগ্নে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মুখোশধারী আততায়ীদের গুলিতে মাথায় গুরুতর আঘাত পান হাদি। ছয় দিন জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রে থাকার পর তাঁর মৃত্যু বৃহস্পতিবার রাতে নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানী ঢাকাসহ একাধিক শহরে হিংসাত্মক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

   

সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা প্রথোম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে ভাঙচুর চালাচ্ছে। রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের দলীয় দফতরেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গভীর রাত পর্যন্ত ঢাকার একাধিক এলাকা কার্যত থমথমে ছিল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করতে হয়।

এই আবহে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূস হাদির মৃত্যুকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পরিসরের জন্য ‘গভীর আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্তের আশ্বাস দেন এবং দেশবাসীকে সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানান। তবে বাস্তবে পরিস্থিতি যে কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশে সীমাবদ্ধ নেই, তা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে নিরাপত্তা বিশ্লেষণে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অস্থিরতার নেপথ্যে আইএসআইয়ের ভূমিকা সরাসরি নয়, বরং ‘ফ্যাসিলিটেটর’-এর। জামাত-ই-ইসলামি ও তাদের ছাত্র ও মাদ্রাসা-সংযুক্ত সংগঠনগুলিকে প্রকাশ্যে নেতৃত্ব না দিতে নির্দেশ দিয়ে, পর্দার আড়াল থেকে আন্দোলনকে উসকে দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য একটাই—আন্দোলন যেন স্বতঃস্ফূর্ত ও দেশীয় বলেই প্রতীয়মান হয়, অথচ তার গতিপথ নিয়ন্ত্রিত থাকে বাইরের শক্তির দ্বারা।

এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ডিজিটাল ও আর্থিক সহায়তা। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, পাকিস্তান-সংযুক্ত কিছু নেটওয়ার্ক থেকে অর্থ ও অনলাইন সমর্থন পাচ্ছে নির্দিষ্ট বয়ানবাহী প্ল্যাটফর্ম। একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, যেগুলি অশান্তি উসকে দিচ্ছে ও ভারত-বিরোধী বক্তব্য ছড়াচ্ছে, সেগুলির অপারেশন পাকিস্তানের ভূখণ্ড থেকেই পরিচালিত হচ্ছে বলে সন্দেহ। শেখ হাসিনার ‘রক্ষাকর্তা’ হিসেবে ভারতকে চিত্রিত করে জনমনে ক্ষোভ উসকে দেওয়াই এই প্রচারের মূল উদ্দেশ্য।

এই প্যাটার্ন আইএসআইয়ের পুরনো ‘প্লজ়িবল ডিনায়েবিলিটি’ নীতিরই আধুনিক সংস্করণ—যেখানে স্থানীয় সংগঠন রাস্তায় ভিড় ও মুখ জোগায়, আর নেপথ্যে থেকে বহিরাগত শক্তি যোগায় মতাদর্শ, অর্থ ও ডিজিটাল অস্ত্র। ফলে আন্দোলনের গায়ে থাকে দেশীয় রং, কিন্তু তার দিকনির্দেশ নির্ধারিত হয় বাইরে থেকে।

বাংলাদেশে অস্থিরতা বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতের পূর্ব সীমান্ত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায়—এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাই আইএসআইয়ের আগ্রহের কেন্দ্রে। নির্বাচন-পূর্ব এই অস্থিরতা দিল্লির কৌশলগত চাপ বাড়াতে পারে, যা পাকিস্তানের দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সমীকরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলার ঘটনাগুলিকে ‘প্রতীকী সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, এটি কেবল ক্ষণিকের সহিংসতা নয়, বরং জনমনে ভারতের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ ও বৈরিতা তৈরি করার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা—যে মুহূর্তে বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে সংবেদনশীল অবস্থায় দাঁড়িয়ে।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন