
ঢাকা: নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেই ঢাকায় ফের চালু হল ভারতের ভিসা আবেদন কেন্দ্র (আইভিএসি)। বৃহস্পতিবার জামুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ঢাকার প্রধান আইভিএসি ফের কাজ শুরু করেছে। তবে একইসঙ্গে বাংলাদেশের আরও দু’টি শহর—খুলনা ও রাজশাহিতে অবস্থিত আইভিএসি-গুলি নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধই থাকল।
“মার্চ টু ইন্ডিয়ান হাই কমিশন” কর্মসূচি
ঢাকার জামুনা ফিউচার পার্কের আইভিএসি রাজধানীতে ভারতের সমস্ত ভিসা পরিষেবার প্রধান কেন্দ্র। বুধবার ‘জুলাই ঐক্য’ নামের একটি কট্টরপন্থী সংগঠনের ডাকে “মার্চ টু ইন্ডিয়ান হাই কমিশন” কর্মসূচির ঘোষণার জেরে কেন্দ্রটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। ওই কর্মসূচিতে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের প্রত্যাবর্তনের দাবি তোলা হয়। দু’জনকেই মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল—এমনটাই জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা পিটিআই।
যদিও ঢাকায় পরিষেবা স্বাভাবিক হয়েছে, তবু দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের খুলনা এবং উত্তর-পশ্চিমের রাজশাহিতে অবস্থিত আইভিএসি এখনও বন্ধ। আইভিএসি-র সরকারি ওয়েবসাইটে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে আজ (১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫) রাজশাহি ও খুলনার আইভিএসি বন্ধ থাকবে। যাঁদের আজ অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল, তাঁদের পরবর্তী তারিখে নতুন সময় দেওয়া হবে।”
শেখ হাসিনা-সহ সমস্ত হত্যাকারীদের প্রত্যাবর্তন
রাজশাহিতে বৃহস্পতিবার ডজনখানেক বিক্ষোভকারী সহকারী ভারতীয় হাই কমিশনের দফতরের দিকে মিছিল করার চেষ্টা করেন। তাঁদের দাবি ছিল, “শেখ হাসিনা-সহ সমস্ত হত্যাকারীদের প্রত্যাবর্তন।” পুলিশ প্রথমে মিছিল আটকে দেয় এবং জানায়, বিক্ষোভকারীদের দাবি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। যদিও ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করলে সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। দাঙ্গা-নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামে সজ্জিত পুলিশ শেষ পর্যন্ত মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করে।
খুলনাতেও ‘ইউনিটি এগেইনস্ট ইন্ডিয়ান হেজেমনি’ ব্যানারে বিক্ষোভকারীরা সহকারী ভারতীয় হাই কমিশনের দিকে এগোতে চাইলে নিরাপত্তাবাহিনী তা প্রতিহত করে। খুলনার ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ তাজুল ইসলাম সংবাদ সংস্থাকে জানান, “কঠোর নজরদারি চালিয়ে আমরা তাঁদের মিশনের দিকে এগোতে দিইনি। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের পর বিক্ষোভকারীরা সরে যায়।”
একাধিকবার ভারত-বিরোধী বিক্ষোভ
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও বাংলাদেশের অন্যান্য শহরেও একাধিকবার ভারত-বিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট পাঁচটি আইভিএসি রয়েছে—ঢাকা, খুলনা, রাজশাহি ছাড়াও চট্টগ্রাম ও সিলেটে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়েছে। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাই কমিশনার মহম্মদ রিয়াজ হামিদুল্লাকে তলব করে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনের নিরাপত্তা সংক্রান্ত হুমকি এবং বাংলাদেশি রাজনৈতিক নেতাদের ভারত-বিরোধী উসকানিমূলক মন্তব্যের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায় ভারত।
এর তিন দিন আগেই ঢাকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত প্রণয় ভার্মাকে তলব করেছিল বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক। ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে শেখ হাসিনার “উসকানিমূলক” মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় নয়াদিল্লি স্পষ্ট করে জানায়, বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনও কার্যকলাপ চালাতে ভারত কখনও তার ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেয়নি।
শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর থেকেই ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক ক্রমশ চাপে রয়েছে। ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের জেরে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন এবং বর্তমানে দিল্লির একটি গোপন নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছেন বলে জানা যায়।
সম্প্রতি বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ছাত্র আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অভিযানের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তাঁর প্রত্যর্পণের দাবি ঢাকা একাধিকবার জানালেও, নয়াদিল্লির বক্তব্য—বিষয়টি এখনও “বিবেচনাধীন”।
এই প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং জনরোষ—সব মিলিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এক গভীর অনিশ্চয়তার পর্বে দাঁড়িয়ে বলে মত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের।










