নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু আতঙ্ক, হিন্দু পরিবারের পাঁচ বাড়িতে আগুন

ঢাকা: বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান সংখ্যালঘু নির্যাতনের (Bangladesh minority violence) আরও একটি উদ্বেগজনক ঘটনা সামনে এসেছে। পিরোজপুর জেলার ডুমরিতলা গ্রামে একটি হিন্দু পরিবারের অন্তত পাঁচটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের…

নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু আতঙ্ক, হিন্দু পরিবারের পাঁচ বাড়িতে আগুন

ঢাকা: বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান সংখ্যালঘু নির্যাতনের (Bangladesh minority violence) আরও একটি উদ্বেগজনক ঘটনা সামনে এসেছে। পিরোজপুর জেলার ডুমরিতলা গ্রামে একটি হিন্দু পরিবারের অন্তত পাঁচটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ঘটনাটি ঘটে ২৮ ডিসেম্বর রাতে। যদিও এই ঘটনায় কোনও প্রাণহানি হয়নি, তবে পরিবারের বহু বছরের সঞ্চিত সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে।

Advertisements

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ঘটনার সময় পরিবারের অধিকাংশ সদস্য আত্মীয়ের বাড়িতে থাকায় বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। বাড়িতে ছিলেন কেবল একজন প্রবীণ সদস্য। তিনিই প্রথম একটি ঘর থেকে আগুনের শিখা দেখতে পান এবং চিৎকার করে প্রতিবেশীদের সতর্ক করেন। কিন্তু ততক্ষণে আগুন ভয়াবহ রূপ নেয়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশাপাশি থাকা আরও চারটি বাড়িতে।

   

স্থানীয়রা জল ও বালতি নিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। পরে দমকল বাহিনী পৌঁছালেও ততক্ষণে ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র, নগদ অর্থ, জমির দলিল, শিক্ষা সংক্রান্ত সার্টিফিকেট, পরিচয়পত্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে আগুন লাগার সঠিক কারণ এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। তবে একাধিক সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, পরিকল্পিতভাবে একটি ঘরের ভেতরে কাপড়詮 গুঁজে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনায় এলাকায় নতুন করে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে।

পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মানজুর আহমেদ সিদ্দিকি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে কথা বলে আশ্বাস দেন যে, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হবে এবং দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। তবে এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে আগুনের ভয়াবহ লেলিহান শিখা একের পর এক বাড়ি গ্রাস করছে এবং স্থানীয় মানুষ আতঙ্কের মধ্যে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে নতুন করে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

উল্লেখযোগ্যভাবে, এই অগ্নিসংযোগের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (HRCBM)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত হিন্দু সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অন্তত ৭১টি ধর্ম অবমাননার অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। এই ঘটনাগুলি দেশের ৩০টিরও বেশি জেলায় ছড়িয়ে রয়েছে।

HRCBM-এর মতে, এই ধরনের ঘটনাগুলির পুনরাবৃত্তি ও বিস্তার প্রমাণ করে যে, এগুলি কোনও বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। বরং ধর্মীয় অভিযোগকে হাতিয়ার করে সংখ্যালঘুদের উপর সংঘবদ্ধ ও পদ্ধতিগত হামলার প্রবণতা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই এই অভিযোগের পর উত্তেজিত জনতার হাতে আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

এর আগে ময়মনসিংহ জেলার বালুকায় ২৯ বছর বয়সি হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা এবং পরে দেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়ায়। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়াও রাজবাড়ি শহরে অমৃত মণ্ডল ওরফে সম্রাট নামে এক হিন্দু যুবকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি আরও সক্রিয় হয়েছে। অন্তর্বর্তী ইউনুস সরকারের আমলে নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই সংখ্যালঘুদের উপর হামলার আশঙ্কা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামাজিক সম্প্রীতি, সংখ্যালঘু অধিকার ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

Advertisements