ছায়ানটকে নিষিদ্ধ পল্লির সঙ্গে তুলনা বাংলাদেশি লেখকের

ঢাকা: বাংলাদেশের লেখক ও অনলাইন ইসলামপন্থী ব্লগার শাফিউর রহমান ফারাবীর একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। ছায়ানট, উদীচি, প্রথম আলো ও…

farabi-calls-chhayanaut-red-light-area-row-bangladesh-controversy

ঢাকা: বাংলাদেশের লেখক ও অনলাইন ইসলামপন্থী ব্লগার শাফিউর রহমান ফারাবীর একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। ছায়ানট, উদীচি, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে (Chhayanaut) তিনি “নিষিদ্ধ পল্লি”-র সঙ্গে তুলনা করেছেন। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকাকেও কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন। তাঁর এই মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে—সমালোচনা ও সমর্থন, দুই শিবিরেই আলোচনা ছড়িয়েছে।

Advertisements

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে ফারাবী দাবি করেন, শেখ হাসিনার সরকার পতনের পরও দেশে প্রকৃত পরিবর্তন আসেনি। তিনি লেখেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের এক বছরেরও বেশি পরে, ২০২৫ সালের ২২ আগস্ট তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। কেন তাঁর জামিন পেতে এক বছর ১৭ দিন লেগেছে, সে বিষয়ে তিনি ভবিষ্যতে বিস্তারিত বলবেন বলেও ইঙ্গিত দেন।

   

পোস্টে ফারাবী কারাজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দাবি করেন, তাঁর সঙ্গে এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আচরণে বিস্তর পার্থক্য ছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। ডিবি হেফাজতে তাঁকে মেঝেতে বসিয়ে রাখা হতো, কানে চড় মারা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এমনকি সেই আঘাতের ব্যথা আজও অনুভব করেন বলে দাবি করেন। অন্যদিকে, পরবর্তী সময়ে কারাগারে আসা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তুলনামূলকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে ছিলেন বলেও তাঁর অভিযোগ।

তিনি আরও বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে এবং সমমনা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাস দমন আইনের অপপ্রয়োগ করা হয়েছে। তাঁর নিজের বিরুদ্ধেও এই আইনে যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ধরনের “ড্রাকোনিয়ান আইন” প্রয়োগ বন্ধ হবে বলে আশা করেছিলেন, কিন্তু তা বাস্তবে ঘটেনি বলে তিনি দাবি করেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি উত্তরায় ইসকনবিরোধী মিছিলে একটি ডামি রাইফেল বহনের অভিযোগে একজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা হওয়ার কথা উল্লেখ করেন, যিনি এখনও কারাগারে রয়েছেন বলে তাঁর দাবি।

এই প্রেক্ষাপটেই ফারাবী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তীব্র ভাষা ব্যবহার করেন। তিনি লেখেন, “কোনো সভ্য সমাজে নিষিদ্ধ পল্লি থাকতে পারে না। নিষিদ্ধ পল্লি মানবতার অপমান।” এরপর তিনি দাবি করেন, ছায়ানট ও উদীচির মতো সংগঠনগুলো নাকি বাংলাদেশের “সাংস্কৃতিক নিষিদ্ধ পল্লি”, আর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার হচ্ছে “মিডিয়া জগতের নিষিদ্ধ পল্লি”। এই মন্তব্য ঘিরেই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুস এইসব তথাকথিত “নিষিদ্ধ পল্লি” উচ্ছেদ না করে বরং তাঁদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওপর দমনমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তাঁর দাবি, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং একটি নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের বিষয় আড়াল করতেই এসব তথ্য সামনে আনা হচ্ছে।

পোস্টে তিনি বিশেষভাবে “শহীদ ওসমান হাদি” নামের একজন ব্যক্তির মৃত্যুর প্রসঙ্গ তোলেন এবং দাবি করেন, সেই হত্যার বিচার বা জবাবদিহি থেকে জনদৃষ্টি ঘোরাতেই মিডিয়া ও প্রশাসন অন্য ইস্যু সামনে আনছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিক্রমপুরী হুজুরকে ডিটেনশনে নেওয়ার ঘটনাও সেই কৌশলের অংশ। তাঁর ভাষায়, এর ফলে জাতির মনোযোগ ঘুরে যাচ্ছে এবং প্রকৃত প্রশ্নগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছে।

ফারাবীর ভাষা ছিল অত্যন্ত কড়া ও আক্রমণাত্মক। তিনি লিখেছেন, “এখন আর বাঙালি জাতি শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বদলা নিতে চায় না; তারা প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, উদীচি আর ছায়ানটের নৃত্যের কংকর ঝনির মধ্যে হারিয়ে গেছে।” একই সঙ্গে তিনি ইনকিলাব মঞ্চের সমালোচনা করে বলেন, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক মান নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

উল্লেখ্য, শাফিউর রহমান ফারাবী দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত একটি নাম। তিনি একজন অনলাইন ইসলামপন্থী ব্লগার ও কর্মী হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডে প্ররোচনার অভিযোগে ২০১৫ সালের ২ মার্চ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৬ ও ২০২১ সালে মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে হুমকির অভিযোগে পৃথক সাজাও দেওয়া হয়।

অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড ঘটে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে। তদন্তে উঠে আসে, হত্যার আগে সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে লক্ষ্য করে একাধিক হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ফারাবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি এসব হুমকির অন্যতম উৎস ছিলেন। যদিও তিনি নিজে বরাবরই দাবি করে আসছেন যে তাঁকে রাজনৈতিক কারণে টার্গেট করা হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন ইসলামপন্থী সংগঠন ও ছাত্র গোষ্ঠী ফারাবীসহ কয়েকজন বন্দিকে “রাজনৈতিক বন্দি” দাবি করে মুক্তির আন্দোলন শুরু করে। ডিসেম্বর ২০২৪ ও মে ২০২৫-এ তার মুক্তির দাবিতে একাধিক বিক্ষোভও হয়। শেষ পর্যন্ত প্রায় এক দশক কারাভোগের পর ২০২৫ সালের ২২ আগস্ট কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান।

ফারাবীর সাম্প্রতিক এই ফেসবুক পোস্ট আবারও দেখিয়ে দিল, বাংলাদেশে মতাদর্শ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনীতির সংঘাত কতটা তীব্র। ছায়ানট বা উদীচির মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে “নিষিদ্ধ পল্লি”-র তুলনা সাংস্কৃতিক মহলে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য ঘিরে প্রশ্ন উঠছে—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও উসকানিমূলক বক্তব্যের সীমারেখা কোথায় টানা উচিত।

এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এর জবাবে কী অবস্থান নেয়, সেটাই এখন দেখার। তবে এটুকু স্পষ্ট, ফারাবীর বক্তব্য নতুন করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে তীব্র মেরুকরণকে সামনে এনে দিয়েছে।

Advertisements