দু’জন বেগম, এক লড়াই থেকে দুই শিবির: খালেদা জিয়া-শেখ হাসিনার সংঘাতের ইতিহাস

Battle of the Begums Bangladesh politics বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে যে দ্বন্দ্ব রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণ করেছে, প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতবিক্ষত করেছে এবং গণতন্ত্রকে…

Battle of the Begums Bangladesh politics

Battle of the Begums Bangladesh politics

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে যে দ্বন্দ্ব রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণ করেছে, প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতবিক্ষত করেছে এবং গণতন্ত্রকে ক্রমে অন্তঃসারশূন্য করে তুলেছে—তা এক কথায় শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার দ্বন্দ্ব। মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কার্যত অবসান ঘটল সেই দীর্ঘ ‘বেগমদের যুদ্ধ’-এর একটি কেন্দ্রীয় অধ্যায়ের। তবে এই সংঘাত কোনও সাধারণ ক্ষমতার লড়াই ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশের আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে এক অনবরত সংঘর্ষ।

Advertisements

রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্রচিন্তা

শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল দুই রাজনৈতিক নেত্রীর ব্যক্তিগত শত্রুতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ধীরে ধীরে তাঁরা হয়ে ওঠেন স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের দু’টি বিপরীত রাষ্ট্রদর্শনের প্রতীক। শেখ হাসিনা বহন করছিলেন মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাতিরাষ্ট্রের ধারণা। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর এক বিকল্প বয়ান, যেখানে রাষ্ট্রের পরিচয়কে ইসলামি সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করার সচেতন প্রয়াস ছিল।

   

এই দ্বন্দ্বই বাংলাদেশের রাজনীতিকে রূপ দেয় এক নির্মম ‘জিরো-সাম’ কাঠামোয়—যেখানে বিজয়ী পক্ষ শাসন করে নিরঙ্কুশভাবে, আর পরাজিত পক্ষকে রাজনৈতিক প্রান্তিকতা, আইনি হয়রানি এবং কখনও কারাবাসের মুখোমুখি হতে হয়।

রক্তাক্ত উত্তরাধিকার Battle of the Begums Bangladesh politics

এই সংঘাতের উৎস নিহিত স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রক্তমাখা অধ্যায়ে। শেখ হাসিনা হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা—যিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন। সেই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি ছিল না; তা রাষ্ট্রের ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দেয় এবং শেখ হাসিনাকে দীর্ঘ নির্বাসনের পথে ঠেলে দেয়।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রাপথও একইভাবে গড়ে ওঠে ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে। তাঁর স্বামী, সেনানায়ক জিয়াউর রহমান, বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তী ক্ষমতার শূন্যতায় উঠে এসে রাষ্ট্রপতি হন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের বয়ান থেকে সরে এসে রাষ্ট্রের পরিচয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেন। ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলে, খালেদা জিয়া রাজনীতিতে প্রবেশ করেন—স্বামীর উত্তরাধিকার রক্ষাকারী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় মুখ হিসেবে।

সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যের ক্ষণস্থায়ী অধ্যায়

গভীর বৈরিতা সত্ত্বেও আশির দশকে ইতিহাস দুই বেগমকে এক বিরল সমীকরণে বেঁধে ফেলে। তখন বাংলাদেশ শাসিত হচ্ছিল সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের দ্বারা। আওয়ামি লিগ ও বিএনপি আলাদা পথে আন্দোলন চালালেও, লাগাতার হরতাল, ছাত্র আন্দোলন ও রাজপথের উত্তেজনা দেশকে কার্যত অচল করে দেয়।

দশকের শেষ দিকে দুই নেত্রী উপলব্ধি করেন-এরশাদকে সরাতে হলে ঐক্য অপরিহার্য। ব্যক্তিগত বিদ্বেষ আপাতত সরিয়ে রেখে তাঁরা একত্রিত হন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন, বিশেষত ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে, শেষ পর্যন্ত সামরিক শাসনের পতন ঘটায়। ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পদত্যাগ ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।

গণতন্ত্রের পরেও সংঘাত

কিন্তু গণতন্ত্র ফিরলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলায়নি। নব্বই ও দুই হাজারের দশকে বেগমদের দ্বন্দ্ব আরও হিংস্র ও সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে। নির্বাচন হয়ে দাঁড়ায় অস্তিত্বের প্রশ্ন। সংসদ বয়কটে অচল হয়। রাজপথ পরিণত হয় সংঘর্ষের ময়দানে।

ক্ষমতায় এলে দুই নেত্রীই রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছেন প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে, দুর্নীতির মামলা, গ্রেফতার, প্রশাসনিক চাপ এবং আইনগত কৌশলের মাধ্যমে। রাজনীতি আর নীতিনির্ধারণ বা সমঝোতার ক্ষেত্র রইল না; তা পরিণত হল প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার প্রক্রিয়ায়।

এর ফল ছিল সুদূরপ্রসারী। প্রতিষ্ঠান দুর্বল হল, নির্বাচনের প্রতি আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হল, আর রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা স্থায়ী রূপ নিল।

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার পতন

এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সংঘর্ষক্ষেত্র ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। খালেদা জিয়া একে সুষ্ঠু নির্বাচনের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে দেখতেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতা সুসংহত করার পর একে অসাংবিধানিক ও অপব্যবহারযোগ্য বলে বাতিল করেন।

২০১১ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়। এর পরবর্তী নির্বাচনগুলো, বিশেষত ২০১৪ ও ২০১৮-বয়কট, কারচুপির অভিযোগ ও দমননীতির অভিযোগে আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

অসম দ্বন্দ্ব ও একতরফা শাসন

দুই হাজার দশকের মাঝামাঝি এসে ‘বেগমদের যুদ্ধ’ ক্রমে একতরফা হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনা দেশের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা দৃঢ় করেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবির পাশাপাশি তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও বিরোধী কণ্ঠ দমনের অভিযোগও বাড়তে থাকে।

অন্যদিকে দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে খালেদা জিয়া কার্যত রাজনীতির বাইরে চলে যান। বিএনপি নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে, আর আওয়ামি লিগ রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর প্রায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

২০২৪-এর মোড় ও এক অধ্যায়ের ইতি

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে খালেদা জিয়া মুক্তি পান এবং পরবর্তী মাসগুলোতে মামলাগুলি থেকে খালাস পান। তিনি ফিরে আসেন রাজনৈতিক মঞ্চে-এই বার ক্ষমতার দাবিদার হিসেবে নয়, বরং এক নৈতিক প্রতীক হিসেবে।

৮০ বছর বয়সে দীর্ঘ অসুস্থতার পর তাঁর মৃত্যু এমন এক সময়ে এল, যখন বাংলাদেশ আবার নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। তাঁর প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হল ‘বেগমদের যুদ্ধ’-এর এক দীর্ঘ অধ্যায়। কিন্তু যে রাজনীতি এই দ্বন্দ্ব তৈরি করেছিল, তার ছায়া এখনও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে প্রভাবিত করে যাবে।

Bangladesh: The iconic ‘Battle of the Begums’ ends as former PM Khaleda Zia passes away at 80. Explore the 40-year rivalry with Sheikh Hasina that shaped Bangladesh’s democracy, institutions, and its future ahead of the 2026 elections.

Advertisements