
বাংলাদেশে মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক ভারসাম্য যে ক্রমশ নড়বড়ে হয়ে উঠছে, তার আরও একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলল বুধবার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রীর সমতুল্য দায়িত্বে থাকা খোদা বখ্শ চৌধুরীর পদত্যাগ রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছেন। সরকারের জারি করা গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে সেই সিদ্ধান্তের স্বীকৃতি মিলেছে।
এই ইস্তফাকে নিছক প্রশাসনিক রদবদল বলে দেখতে নারাজ ঢাকার রাজনৈতিক মহল। বরং, একে দেখা হচ্ছে কট্টর চাপের মুখে সরকারের একটি সচেতন ছাড় বা ‘নিচের স্তরে বলি’ দেওয়ার কৌশল হিসেবে।
ছাত্রনেতা শরিফ ওসমান হাদিকে ঘিরে তৈরি হওয়া মামলায় গ্রেফতার না হওয়াকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই সরকারের উপর চাপ বাড়ছিল। হাদির সহ-প্রতিষ্ঠিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল জাবের প্রকাশ্যেই ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) এম ডি জাহাঙ্গির আলম চৌধুরীর পদত্যাগ দাবি করেন। অভিযোগ ছিল—প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে দোষীদের আড়াল করছে।
শেষ পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা পদে বহাল থাকলেও তাঁর অধস্তন স্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীলের প্রস্থান এই বার্তা দিচ্ছে যে, অন্তর্বর্তী সরকার রাজপথের চাপ সামাল দিতে প্রশাসনিক স্তরে সমঝোতার পথেই হাঁটছে। প্রশ্ন উঠছে—এই কৌশল কি পরিস্থিতি শান্ত করবে, না কি উল্টো কট্টর শক্তিগুলিকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে? কারণ, খোদা বখ্শ চৌধুরীর ইস্তফা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
ইতিমধ্যেই ইউনূস সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ একাধিকবার রদবদলের মুখে পড়েছে। চলতি বছরেই ছাত্রনেতা উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের প্রস্থান অন্তর্বর্তী সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রথম বড় প্রশ্ন তোলে। তার পর ডিসেম্বরের ১০ তারিখে একই দিনে ইস্তফা দেন স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রকের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ শোজিব ভূঁইয়া এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।
এই ধারাবাহিক ইস্তফা সরকারের প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও নৈতিক কর্তৃত্ব—দু’টির উপরই ছায়া ফেলেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, প্রতিটি প্রস্থান অন্তর্বর্তী সরকারের ‘নিরপেক্ষ ও স্থিতিশীল ব্যবস্থাপনা’র দাবি আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।
চাপ এখানেই থামেনি। সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রকাশ্যেই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তৃত্ব যে একাধিক রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির দ্বারা চ্যালেঞ্জের মুখে, তা আর গোপন নয়।
সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, একাংশ উপদেষ্টা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছেন বলেই পদ ছাড়ছেন। আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনার কথাও সামনে আনা হচ্ছে। তবে বিরোধীদের মতে, এই যুক্তি পুরো চিত্র তুলে ধরে না।
তাঁদের যুক্তি, সমস্যা প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক। ক্রমশ উগ্র হয়ে ওঠা জনচাপ, আল্টিমেটাম-নির্ভর দাবি এবং তার সামনে সরকারের নতি স্বীকার, এই প্রবণতাই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
যে অন্তর্বর্তী সরকার এক সময় প্রযুক্তিবিদ-নির্ভর, নিরপেক্ষ ও সাময়িক ব্যবস্থাপনা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, আজ তার চরিত্র বদলাচ্ছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রতিষ্ঠান নয়, চাপ ও সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত—এই প্রবণতা যত বাড়বে, নির্বাচন যত এগোবে, ততই এই ভঙ্গুরতা আরও প্রকট হবে।










