
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার এক দশকেরও বেশি সময়ের শাসন নিয়ে ক্ষোভ জমছিল বহুদিন ধরেই। প্রশাসনিক দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উপর নির্যাতন, এবং গুম-খুনের ধারাবাহিকতা সেই ক্ষোভকে জ্বালিয়ে রেখেছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলনের জোয়ার সেই বিস্ফোরণের পথ তৈরি করে। আগস্টে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন হাসিনা। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় কেটে গেলেও মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও বহু কিছু যেন একই জায়গায় রয়ে গিয়েছে।
দুষ্টচক্র থেকে বেরোতে পারেনি
বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK)-এর সাম্প্রতিক সংকলন দেখাচ্ছে, দেশটি এখনো extrajudicial killing—বিচারবহির্ভূত হত্যা—ও custodial torture-এর দুষ্টচক্র থেকে বেরোতে পারেনি। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের মধ্যে নথিভুক্ত হয়েছে ৩৭টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা। এর মধ্যে ১৪ জন পুলিশের ‘এনকাউন্টার’ বা গ্রেফতারের আগের গুলিবিনিময়ে নিহত এবং ১১ জন সরাসরি পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গিয়েছেন। একই সময়ে হেফাজতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৯৫, যার মধ্যে ৬৪ জনই ছিলেন আন্ডারট্রায়াল।
মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটনের ভাষায়, “অত্যাচার-নির্যাতন বন্ধ হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই। অপরাধীরা আগের মতোই ক্ষমতার আসনে আছে, জবাবদিহিরও কোনও সুযোগ নেই। পরের সরকার কঠোর পদক্ষেপ না নিলে এই মৃত্যুর সংস্কৃতি বন্ধ হবে না।”
গুম-অপহরণ
হাসিনার সময় গুম-অপহরণ ছিল রাষ্ট্রীয় সন্দেহভাজন নিপীড়নের এক নির্মম অধ্যায়। ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের ber infamous ‘আয়না ঘর’—House of Mirrors—নিয়ে বহু প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বছরের পর বছর অন্ধকারে রাখা হতো। আট বছরের মতো একটানা সলিটারি কনফাইনমেন্টেও ছিলেন অনেকে। যারা বেঁচে ফিরেছেন, তারা আজও সেই ভয়াবহ অধ্যায় নিয়ে মুখ খুলতে ভয় পান। আনুমানিক শতাধিক মানুষ এখনো নিখোঁজ, যাদের বেশিরভাগই আওয়ামী বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী।
বিএনপি-র অ্যাক্টিং চেয়ারম্যান তারেক রহমান বুধবার (১০ ডিসেম্বর) অভিযোগ করেছেন, “সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপি-র নেতাকর্মীরা। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, হেফাজতে মৃত্যু, মিথ্যা মামলা—সব কিছুর বৃহত্তম ভুক্তভোগী আমাদের কর্মীরা।”
দায় চাপাচ্ছেন বিএনপি-র উপর
অন্যদিকে নির্বাসিত আওয়ামী নেতারা এখনো দায় চাপাচ্ছেন বিএনপি-র উপর। হাসিনার প্রাক্তন তথ্যপ্রচারমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত ‘এক্স’-এ পোস্ট করে দাবি করেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার আমলে ২০০৪ সালেই র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB) তৈরি হয় এবং সেসময় থেকেই বহু ‘ক্রসফায়ার’ ও extrajudicial killing-এর অভিযোগ উঠতে থাকে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)-এর হিসেব অনুযায়ী, ২০০৪ সালের পর থেকে র্যাবের বিরুদ্ধে অন্তত ৩৫০ হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক দায়-দায়িত্বের এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেও স্পষ্ট হচ্ছে একটাই বিষয়—হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা কমেনি। Odhikar-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৪০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন, লাঠিচার্জের ঘটনায় মারা গিয়েছেন ১৫৩ জন। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ গিয়েছে অন্তত ২৮১ জনের।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বাড়ছে
আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বাড়ছে। অক্টোবর মাসে ছয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে চিঠি দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়।
যদিও ইউনূস সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছে, যাতে হাসিনা আমলের গুম-খুন ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাগুলি খতিয়ে দেখা হবে, কিন্তু বাস্তবে extrajudicial killing থামেনি। বরং, মানবাধিকার কর্মীদের মতে, দেশের প্রশাসনিক যন্ত্রের গভীরে জমাট বাঁধা নিপীড়নের সংস্কৃতি এখনো অটুট।
হাসিনা হোন বা ইউনূস—বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের এই অধ্যায় যেন একই বইয়ের নতুন পৃষ্ঠা মাত্র।










